মঞ্চজুড়ে শিশুরা, বড়দের জন্য শুধু দর্শকের আসন
ছবি: সংগৃহীত
মঞ্চে যাঁরা দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের কেউই বয়সে বড় নন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, স্বাগত বক্তব্য, গান, আবৃত্তি, নাচ—সবকিছুর দায়িত্বই ছিল শিশুদের হাতে। বড়দের জন্য বরাদ্দ ছিল শুধু দর্শকের আসন। এদিন পুরো মঞ্চটিই যেন ছিল শিশুদের দখলে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থার ডা. সাখাওয়াত হোসেন খান মুক্তমঞ্চে দেখা যায় এমনই ব্যতিক্রমী আয়োজন। বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গাইবান্ধা পরিচালিত সত্যেন সেন সংগীত বিদ্যালয় এ সাংস্কৃতিক আসরের আয়োজন করে।
‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’ শিরোনামের এ আসর চলে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। পুরো আয়োজনের উপস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরা।
অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে সন্ধি, অবনী ও মৈত্রী। অতিথি ও দর্শকদের স্বাগত জানায় শিক্ষার্থী পরমব্রত। এরপর শিশুসুলভ সারল্যে একের পর এক পরিবেশনার নাম ঘোষণা করে তারা। সম্মিলিত গান, নজরুলসংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যে অংশ নেয় তরী, দিপান্বিতা, প্রার্থনা, সন্ধি, শামস, রাশিন ও নভোনীলসহ অন্যরা। ছোট ছোট কণ্ঠের সম্মিলিত সুর আর পায়ের তালে নৃত্যের ছন্দে দর্শকসারি মুখর হয়ে ওঠে করতালিতে।
অনুষ্ঠানের নামেও ছিল জাগরণের আহ্বান। সেই ডাক শুধু গানের সুরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিশুদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তা পৌঁছে যায় দর্শকদের ভাবনায়।
এবারের বিশ্ব শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শিশুদের কথা শুনুন, প্রতিটি শিশুর অধিকার রক্ষায় প্রতিদিন সোচ্চার হোন’। এ বার্তাকে সামনে রেখে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। শিশুরাই যখন পুরো মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন প্রতিপাদ্যের ‘শিশুদের কথা শুনুন’ অংশটি যেন বাস্তব রূপ পায়। সেদিন বড়দের কাজ ছিল শোনা, আর শিশুদের কাজ ছিল বলা।
অনুষ্ঠানের শেষে সত্যেন সেন সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ, সুন্দর, বৈষম্যহীন ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের কথা শোনা ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’
উদীচী গাইবান্ধা জেলা সংসদের সভাপতি ও লেখক-গবেষক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, ‘শিশুদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হতে হবে।’
আয়োজকেরা মনে করেন, এ আয়োজন শুধু দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের মাধ্যমে শিশুদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতা যেমন তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি মঞ্চ পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে। শৈশব থেকেই সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা শিশুদের মানবিক ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে সহায়ক।
রাত গভীর হলেও মুক্তমঞ্চে তখনো ছিল শিশুদের কলকাকলি। করতালির মধ্য দিয়ে শেষ হয় সাংস্কৃতিক আসর। দর্শকেরা ঘরে ফেরেন একটি বার্তা নিয়ে—শিশুরা যদি জেগে ওঠে, সকাল ঠিকই হবে।