ড. ইউনূসকে হেনস্থা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

ড. ইউনূসকে হেনস্থা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

সংগৃহীত ছবি

আওয়ামী লীগ যে তালজ্ঞানহীন মাথামোটা লোকদের একটি দল, তা আবারও প্রমাণ করল দলটির কট্টর মুরিদরা। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে হেনস্থা করার মধ্য দিয়ে তারা কি অর্জন করেছে। আওয়ামী ২০০৯ থেকে ২০২৪ এর জুলাই পর্যন্ত টানা সাড়ে পনেরো বছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে পৈতৃক সম্পত্তি বিবেচনা করে জনগণের ওপর হত্যা, গুম থেকে শুরু করে সব ধরনের অত্যাচার নিপীড়ন চালিয়ে যে অপরাধ করেছে, সে অপরাধের জন্য অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা করা তো দূরের কথা, বরং একটির পর আরেকটি অপরাধ করে এবং বিশেষ করে দাম্ভিকতা ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে চাইছে যে, তারা যখন যা করে, সবই সঠিক, হত্যা-গুম করা, মাথা ফাটানো, দখল-চাঁদাবাজি তাদের অধিকার। এ অধিকারের চর্চা তারা তাদের জন্মকাল থেকেই করে আসছে। 

কি ঘটেছিল গত ১২ অক্টোবর সোমবার জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে? অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে জেএফকে বিমানবন্দরে অবতরণ করলে কয়েকজন লোক তাকে ঠেলে নেওয়া হুইল চেয়ারের পেছনে প্রায় শরীর ঘেষাঘেষি করে তার উদ্দেশ্যে নানা আপত্তিকর মন্তব্য করতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লোকগুলো ড. ইউনূসের হুইল চেয়ারের পিছু নিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বার বার  ‘আপনি সন্ত্রাসী, আপনি বাংলাদেশে মানুষ হত্যা করেছেন। কেন এখানে এসেছেন?’ ইত্যাদি বলছেন। ড. ইউনূস এ সময় নীরবতা পালন করেন। ইতোমধ্যে তাকে হেনন্থাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বলে অভিযোগ উঠেছে। ভিডিওতে নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরীকে ড. ইউনূসের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কারণ জানতে চাইতে এবং বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রেফতার এবং হাজার হাজার পুলিশ সদস্যকে হত্যার অভিযোগও তুলতে শোনা যায়। 

ড. ইউনূস বাংলাদেশে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়। ড. মুহম্মদ ইউনূস টার্মিনালে অবস্থানের আগে যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজান চৌধুরী, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, জ্যাকসন হাইটস আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর কায়সার এবং আরও কয়েকজন নেতাকর্মী আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন জানা যায়। 

আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতাকর্মীরা এর আগেও  ২০২৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আগত বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীদের ওপর একই কায়দায় চড়াও হয়েছিল। তাদের ওপর তারা ডিম নিক্ষেপ করেছিল এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজও করেছিল। ওই সময় অন্তবর্তী সরকারের একজন সদস্য নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কনস্যুলেটে হামলা চালিয়েছিল। নিউইয়র্ক পুলিশ হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। গতমাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের একাশিতম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে যোগদান করতে এসে ম্যানহাটানের যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন, আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক অবস্থানকালে প্রায় প্রতিদিন হোটেলের সামনে হাঙ্গামা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।  

ড. ইউনূসের সফরসঙ্গী লামিয়া মোর্শেদ জেএফকে বিমানবন্দরে সংঘটিত ১২ অক্টোবরের ঘটনা সম্পর্কে আজ ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলেছেন যে, প্রফসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনন্থার চেষ্টার পর সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। তার ওপর ওই ঘটনার কোনো প্রভাব পড়েনি।   

আওয়ামী লীগ বার বার চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যায়-অপরাধ করে, দেশকে উজাড় করার মতো অবস্থায় ফেলার শোচনীয় পরিণতির মধ্যে পড়েও ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। সাড়ে পনেরো বছরের বাড়াবাড়ির যে পরিণাম আওয়ামী লীগকে ভোগ করতে হচ্ছে, হত্যাসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মামলার আসামী হয়ে দলটির কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে দেশের বাইরে কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, গ্রেফতার এড়াতে দেশের মুখচেনা প্রায় সকল আওয়ামী লীগারকে দেশের অভ্যন্তরে আত্মগোপনে কাটাচ্ছে। এ কাজগুলো আওয়ামী লীগেরই শেখানো। ক্ষমতার গগন থেকে আওয়ামী লীগের ছিটকে পড়ার এবং বাংলাদেশে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার অধিকারও থেকেও বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে। এমন একটি পরিস্থিতির ফাঁদে আটকে পড়া থাকা সত্ত্বেও বিদেশের মাটিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্থা করার মতো একটি কাণ্ড ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের বরাবরের নির্বুদ্ধিতার পরিচয় নতুন করে দিয়েছে। 

বাংলাদেশের জটিল এক মুহূর্তে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালে বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। তিনি যেচে ক্ষমতায় আসেননি, ক্ষমতা দখলও করেননি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন। তিনি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তার নেতৃত্বে সরকার পরিচালনায় ভুলত্রুটি হতে পারে। তার গৃহীত নীতি বাস্তবায়নে অন্যায় হয়ে থাকলে সমালোচনা, এমনকি তার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা যেতে পারে। কিন্তু বিদেশের একটি বিমানবন্দরে তাকে এভাবে অপদস্ত করা বাঞ্চনীয় তো নয়ই, কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যারা সমগ্র বিশ্বে শিক্ষিত মানুষের কাছে পরিচিত ড. ইউনূসের মতো একজন ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এহেন আচরণ করতে পারে, দেশের মাটিতে তাকে পেলে কী করবে, তা আন্দাজ করতে সমস্যা হয় না।  

যে সময়ে আওয়ামী লীগের উচিত তাদের কৃত অপরাধের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ভবিষ্যতেও সুযোগ পেলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না বলে মুচলেকা দেওয়া, সেখানে দেশে-বিদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দলটিকে খাদের আরও গভীরে ঠেলে দেবে।