প্রতিদিন চা-কফি পান করলে কিডনির ক্ষতি হয়? কী বলছেন বিশেষজ্ঞ

প্রতিদিন চা-কফি পান করলে কিডনির ক্ষতি হয়? কী বলছেন বিশেষজ্ঞ

ফাইল ছবি

সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা কিংবা কফি পান করা অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। তবে নিয়মিত এসব পানীয় পান করলে কিডনির ক্ষতি হয় কি না, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে।

কিডনি বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিমিত পরিমাণে চা-কফি পান সাধারণত কিডনির জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে কতটা পান করছেন, কিভাবে তৈরি করছেন এবং আগে থেকে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে কি না, তার ওপর প্রভাব নির্ভর করতে পারে।

ভারতের সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের লাইফস্টাইল বিভাগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিক্রম কালরা এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

ক্যাফেইন কিভাবে কিডনিকে প্রভাবিত করে?

চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করতে পারে।

অর্থাৎ, এটি সাময়িকভাবে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণ করেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব বেশি লক্ষ করা যেতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে চা-কফি পান করলেই শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হবে। চিকিৎসক বিক্রম কালরার মতে, পরিমিত পরিমাণে চা-কফি পান করলে তা দৈনিক তরল গ্রহণের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হয়।

সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এসব পানীয় পরিমিত পান করলে সাধারণত কিডনির ক্ষতি হয় না।

অতিরিক্ত চা-কফি পান করলে কী ঝুঁকি রয়েছে?

চা-কফি পানের ক্ষেত্রে মূল উদ্বেগ অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ নিয়ে। বেশি পরিমাণে ক্যাফেইন সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

যাঁদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চা পানের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি। চায়ে অক্সালেট নামের প্রাকৃতিক উপাদান থাকে। বিশেষ করে যাঁদের ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাঁরা অতিরিক্ত চা পান করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি শুধু চা পানের ওপর নির্ভর করে না। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং আগে পাথর হওয়ার ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। কফি পানের সঙ্গে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং কিছু গবেষণায় কফি পানের সঙ্গে পাথরের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক দেখা গেছে।

চা-কফিতে চিনি ও দুধ মেশালে কী হয়?

চা-কফিতে অতিরিক্ত চিনি, ফ্লেভারযুক্ত সিরাপ বা মিষ্টি ক্রিমার যোগ করলে শরীরে ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ওজন বৃদ্ধি এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ—দুটিই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তাই কিডনির সুস্থতা বজায় রাখতে চা-কফিতে অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা ভালো।

অন্যদিকে, যাদের কিডনির রোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দুধ ও অন্যান্য উপাদান গ্রহণের পরিমাণ ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। রক্ত পরীক্ষার ফলাফল ও পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসক খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন।

দিনে কতটা চা-কফি পান করা নিরাপদ?

চিকিৎসক বিক্রম কালরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য পরিমিত পরিমাণে চা-কফি পান করা যুক্তিসংগত। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে দৈনিক সর্বোচ্চ ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন সাধারণত বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তবে ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইন সহ্য করার ক্ষমতা ভিন্ন হতে পারে।

এখানে মনে রাখতে হবে, ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন মানে ৪০০ মিলিগ্রাম চা বা কফি নয়। পানীয়ের ধরন, কাপের আকার এবং তৈরির পদ্ধতির ওপর ক্যাফেইনের পরিমাণ নির্ভর করে। তাই দিনে কত কাপ পান করা যাবে, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা সবার জন্য এক নয়।

কিডনি ভালো রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান, চা-কফিতে অতিরিক্ত চিনি পরিহার এবং রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। যাঁদের কিডনির রোগ বা কিডনিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

উল্লেখ্য শুধু কিডনি সুস্থ রাখার জন্য সবার চা-কফি ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিমিত পান, স্বাস্থ্যকর প্রস্তুতপ্রণালি এবং নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকাই গুরুত্বপূর্ণ।