আবহাওয়া বদলালেই মাথাব্যথা? জেনে নিন কারণ ও করণীয়
সংগৃহীত ছবি
ঋতু পরিবর্তনের সময় হঠাৎ মাথাব্যথা শুরু হওয়া অনেকের জন্যই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা কিংবা বর্ষা থেকে শীতের আগমনে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ুচাপের পরিবর্তন শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা মাইগ্রেনের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মাথাব্যথার তীব্রতা বা ঘনঘন হওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে সব ধরনের মাথাব্যথার জন্য আবহাওয়াকে দায়ী করা ঠিক নয়। পানিশূন্যতা, অনিয়মিত ঘুম, খাবার বাদ দেওয়া কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণেও মাথাব্যথা হতে পারে। তাই এর সম্ভাব্য কারণ জানা এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, তা বোঝা জরুরি।
আবহাওয়া পরিবর্তনে কেন মাথাব্যথা হয়?
আবহাওয়ার পরিবর্তন সবার শরীরে একইভাবে প্রভাব ফেলে না। কিছু মানুষ পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। বিশেষ করে মাইগ্রেনের রোগীদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথাব্যথার উদ্দীপক হিসেবে কাজ করতে পারে।
বায়ুচাপের ওঠানামা
বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু মানুষের মাথাব্যথার সম্পর্ক দেখা যায়। কারেন্ট পেইন অ্যান্ড হেডেক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বায়ুচাপের পরিবর্তন ও মাইগ্রেনের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে ঠিক কীভাবে এই পরিবর্তন মাথাব্যথা সৃষ্টি করে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তাপমাত্রার পরিবর্তন
হঠাৎ গরম বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত তাপ কিংবা ঠান্ডা আবহাওয়ার সংস্পর্শে এলে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের মাথাব্যথা হতে পারে। গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বেশি পানি বেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে পানিশূন্যতা তৈরি হয়ে মাথাব্যথা বাড়াতে পারে।
পানিশূন্যতা
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীরের পানির চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান না করলে মাথাব্যথার পাশাপাশি তৃষ্ণা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
আর্দ্রতা, ধুলাবালি ও বায়ুদূষণ
বাতাসে আর্দ্রতার পরিবর্তন, ধুলাবালি, ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ কিছু মানুষের মাথাব্যথা বাড়াতে পারে। ঋতু পরিবর্তনের সময় অ্যালার্জির উপসর্গও বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে নাক বন্ধ থাকা, হাঁচি কিংবা মুখমণ্ডলে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
ঘুম ও দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তন
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক সময় ঘুমের সময়সূচি, শারীরিক কার্যক্রম ও খাবারের অভ্যাসে পরিবর্তন আসে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা কিংবা নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণ হঠাৎ কমিয়ে দেওয়ার কারণেও মাথাব্যথা হতে পারে।
আবহাওয়াজনিত মাথাব্যথা, নাকি মাইগ্রেন?
মাথাব্যথার ধরন ও সঙ্গে থাকা উপসর্গ থেকে সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে শুধু উপসর্গ দেখে সব ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
টেনশন-টাইপ মাথাব্যথা: সাধারণত কপাল, মাথার দুই পাশ কিংবা পেছনে চাপ বা টান ধরার মতো ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাথার চারপাশে শক্ত করে কিছু বেঁধে রাখার মতো অনুভূতি হতে পারে।
মাইগ্রেন: এতে মাঝারি থেকে তীব্র ব্যথা হতে পারে, যা প্রায়ই মাথার এক পাশে বেশি অনুভূত হয়। তবে দুই পাশেও ব্যথা হতে পারে। বমি বমি ভাব, বমি এবং আলো বা শব্দে অস্বস্তি মাইগ্রেনের পরিচিত লক্ষণ। কারও কারও ক্ষেত্রে মাথাব্যথার আগে চোখে আলোর ঝলকানি দেখা বা শরীরের কোনো অংশে ঝিনঝিন করার মতো উপসর্গও দেখা যায়।
সাইনাসজনিত মাথাব্যথা: নাক বন্ধ থাকা, মুখমণ্ডলে চাপ অনুভব করা এবং নাক দিয়ে ঘন সর্দি বের হওয়ার মতো উপসর্গ এর সঙ্গে থাকতে পারে। তবে মাইগ্রেনের কারণেও মুখে চাপ বা নাক বন্ধ থাকার অনুভূতি হতে পারে। তাই সব মাথাব্যথাকেই সাইনাসের সমস্যা মনে করা ঠিক নয়।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় মাথাব্যথা শুরু হলেই যে সেটি আবহাওয়ার কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ব্যথা নতুন ধরনের হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা আগের তুলনায় আলাদা মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ঋতু পরিবর্তনের সময় মাথাব্যথা কমাতে করণীয়
কিছু সাধারণ অভ্যাস মাথাব্যথার ঝুঁকি কমাতে এবং অস্বস্তি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: নিয়মিত পানি পান করুন। গরমে বাইরে থাকলে বা অতিরিক্ত ঘাম হলে শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে বাড়তি মনোযোগ দিন।
সময়মতো খাবার খান: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এড়িয়ে চলুন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সুষম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
ঘুমের নিয়ম বজায় রাখুন: প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। সম্ভব হলে একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
ক্যাফেইন গ্রহণে ভারসাম্য রাখুন: নিয়মিত চা বা কফি পান করলে হঠাৎ করে এর পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজনে ধীরে ধীরে কমান।
অতিরিক্ত গরম ও দূষণ এড়িয়ে চলুন: প্রচণ্ড রোদে দীর্ঘ সময় থাকা কমান। ধুলাবালি, ধোঁয়া কিংবা যেসব পরিবেশগত উপাদানে আপনার মাথাব্যথা বাড়ে, সেগুলোর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
মাথাব্যথার হিসাব রাখুন: কখন ব্যথা হচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে, তীব্রতা কেমন, সেদিনের আবহাওয়া, ঘুম, খাবার ও অন্যান্য উপসর্গ কী ছিল—এসব লিখে রাখুন। এতে মাথাব্যথার সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করা সহজ হতে পারে এবং চিকিৎসককেও মূল্যায়নে সাহায্য করবে।
ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন: মাঝেমধ্যে হওয়া মাথাব্যথায় কিছু ব্যথানাশক উপকারী হতে পারে। তবে ওষুধের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। ঘনঘন ব্যথানাশক গ্রহণ করলে উলটো ওষুধ-অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মাথাব্যথা বাড়তে পারে। অন্য রোগ থাকলে বা নিয়মিত ওষুধ খেলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।
কখন দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি?
হঠাৎ জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে, মাথাব্যথার সঙ্গে হাত-পা দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি কিংবা জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। মাথায় আঘাতের পর মাথাব্যথা শুরু হলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় মাথাব্যথা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে বারবার মাথাব্যথা হলে বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে শুধু আবহাওয়াকে দায়ী না করে সঠিক কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত জীবনযাপন, পর্যাপ্ত পানি পান এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে এ ধরনের অস্বস্তি সামলানো যেতে পারে।