দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন

প্রতিকী ছবি

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আজ সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রামের এক কঠিন বাস্তবতা। আয় সীমিত, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ক্রমবর্ধমান। এই বৈপরীত্যে নিম্ন আয়ের মানুষ, শ্রমজীবী পরিবার ও নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। সংসারের ব্যয় মেটাতে অনেককে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজনেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অথচ বাজারের এই সংকট কেবল অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনমান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়বদ্ধতা। এ পরিস্থিতিতে ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন, ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

ইসলামি অর্থনীতিতে সংযম ও ন্যায়বিচার : ইসলাম মানুষের বৈধ ভোগ ও উপার্জনকে স্বীকৃতি দিয়েছে; কিন্তু অপচয়, সীমা লঙ্ঘন ও অন্যায় সম্পদ আহরণকে নিরুৎসাহিত করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন-‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না’ (সুরা আল আরাফ : ৩১)।

দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষের প্রথম করণীয় হলো আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা, অপ্রয়োজনীয় ভোগ পরিহার, খাদ্যের অপচয় রোধ এবং সামর্থ্য অনুযায়ী জীবন পরিচালনা। তবে ব্যক্তিগত সংযমের উপদেশ দিয়ে বাজারব্যবস্থার ত্রুটি কিংবা নীতিগত দুর্বলতার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। সংকট মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও অপরিহার্য।

মজুতদারি ও মুনাফালোভের বিরুদ্ধে ইসলাম : ব্যবসা ইসলামে সম্মানজনক পেশা; ন্যায্য মুনাফা অর্জনও বৈধ। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনকে জিম্মি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা বাজারে ক্ষতিকর মজুতদারি নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। রসুল (সা.) বলেছেন-‘পাপী ব্যক্তি ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না’ (সহিহ মুসলিম)। এ নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য মানুষের ক্ষতি সাধনকারী মজুতদারি বারণ করা। তাই ব্যবসায়ীদের উচিত স্বচ্ছতা, সততা ও ন্যায্যতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করা। ওজনে কারচুপি, মিথ্যা প্রচারণা, যোগসাজশের মাধ্যমে দাম বাড়ানো এবং দুর্দিনে অস্বাভাবিক মুনাফার লোভ পরিহার করা ইমানি দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না’ (সুরা আল আরাফ : ৮৫)।

জনদুর্ভোগ লাঘবে সম্মিলিত করণীয় : সাধারণ ভোক্তাদের উচিত যাচাই ছাড়া আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকা, বাজারদর তুলনা করা এবং প্রতারণা বা কারসাজির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো। সামর্থ্যবানদের উচিত অসচ্ছল আত্মীয়, প্রতিবেশী ও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো। জাকাত যথাযথভাবে আদায়, সদকা বৃদ্ধি এবং দরিদ্র মানুষের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা সামাজিক সংহতি জোরদার করতে পারে। রসুল (সা.) বলেছেন-‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণে পাশে থাকেন (সহিহ বুখারি)।

অন্যদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, অসাধু সিন্ডিকেট ও কারসাজি প্রতিরোধ, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য এবং ভোক্তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, ন্যায্য মজুরি এবং প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা সম্প্রসারণও জরুরি। কারণ মূল্যস্ফীতির হার কমে গেলেও পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসে না; আয় সেই অনুপাতে না বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলা কেবল বাজারের হিসাব নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্বেরও পরীক্ষা। সাধারণ মানুষ সংযমী হবেন, ব্যবসায়ী সততার পরিচয় দেবেন, সামর্থ্যবানরা অভাবীদের পাশে দাঁড়াবেন এবং রাষ্ট্র ন্যায়সংগত বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে-এ সম্মিলিত উদ্যোগেই জনদুর্ভোগ লাঘবের পথ প্রশস্ত হতে পারে। ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের মর্মকথা হলো, সম্পদ অর্জন বৈধ, কিন্তু মানুষের অধিকার পদদলিত করে নয়। মুনাফা গ্রহণযোগ্য, কিন্তু জনদুর্ভোগকে পুঁজি করে নয়। যে অর্থনীতি মানুষের জীবনকে স্বস্তি দেয় না, যে বাজার দুর্বলের অধিকার রক্ষা করে না এবং যে সমৃদ্ধি মানুষের কষ্টের প্রতি নির্বিকার থাকে-ইসলামের ন্যায়বিচার-ভিত্তিক আদর্শ সেই বাস্তবতার সংশোধন দাবি করে।

♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা