সরকারি মেডিকেল কলেজে তীব্র শিক্ষক সংকট, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ব্যাহত
ফাইল ছবি
শিক্ষক সংকটে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে। এসব সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বছরের পর বছর ধরে তীব্র শিক্ষকসংকট বিরাজ করায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। ফলে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ। শিক্ষক সংকটের কারণে মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মনে করছেন চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জ্যেষ্ঠ পদগুলোতে শিক্ষকসংকটের চিত্র সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ। অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর অর্ধেকের বেশি অংশই শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক এবং প্রতি ২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত ১ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার সিকিভাগও বজায় রাখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও ফার্মাকোলজির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক না পাওয়ায় অন্য বিভাগ থেকে প্রেষণে চিকিৎসক এনে বা অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কোনোমতে কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এর ফলে নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নতুন প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল কলেজগুলোর ক্ষেত্রে এই সংকট আরও গভীর রূপ নিয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গড়ে ওঠা কলেজগুলোতে নিজস্ব ক্যাম্পাস, হাসপাতাল এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষকসংকট অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কলেজে অর্ধেকের বেশি পদ খালি রয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে কোনো অধ্যাপকই কর্মরত নেই। ফলে সেখানকার অধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে কোনোমতে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। এমনকি বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা ও রাজশাহীর মতো পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী বড় মেডিকেল কলেজগুলোতেও শত শত পদ শূন্য পড়ে রয়েছে, যা সামগ্রিক চিকিৎসাশিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেয়া হয় তাতে জটিলতা রয়েছে। শিক্ষক সংকট থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের শিখন পদ্ধতিতে ঘাটতি থাকা স্বাভাবিক। কলেজগুলোর মান উন্নয়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় শুধু শিক্ষকের সংকট যে রয়েছে তা নয়, অবকাঠামো থেকে শুরু করে পরীক্ষাগার-হোস্টেলসহ সবকিছুতেই সংকট রয়েছে। সরকার গত দেড় দশকে বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে। অধিকাংশ মেডিকেল কলেজেই স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা বেশ দুরূহ হয়ে পড়েছে। লোকবল থেকে শুরু করে সব শাখায়ই ঘাটতি রয়েছে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এসব মেডিকেল কলেজের শিক্ষক সংকট দূর করা জরুরি। মেডিকেল কলেজগুলোর অন্যতম শর্ত হলো নিজস্ব হাসপাতাল থাকা, যাতে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে চিকিৎসায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মধ্যে অন্তত ১২ টিরই নিজস্ব হাসপাতাল নেই।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যথাযথ প্রস্তুতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই না করে অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্বিচারে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কারণেই এই করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অথচ পর্যাপ্ত শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই নতুন কলেজ চালুর প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, নিয়মিত শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি না দিয়ে অতিরিক্ত বা সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করায় মেডিকেল কলেজগুলোর প্রকৃত শূন্যতা দূর হচ্ছে না। এই সংকট নিরসনে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, পদোন্নতির দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে নতুন প্রতিষ্ঠান চালুর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা, অন্যথায় মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব হবে না।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের চলতি মাসের তথ্য অনুযায়ী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, কিউরেটর ও প্রভাষক—এই পাঁচ শ্রেণির পদে অনুমোদিত জনবল ৬ হাজার ৫৫৫ জন। কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৫০৩ জন। অর্থাৎ শূন্য পদ ৩ হাজার ৫২টি। গত বছরের জুলাইয়ে অনুমোদিত ৬ হাজার ৩৮৪ পদের মধ্যে শূন্য ছিল ২ হাজার ৭২৫টি। সে হিসাবে এক বছরে পরিস্থিতির কিছুটা অবনতিই হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন বলেন, শিক্ষক সংকট মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান ব্যাহত করছে। এ সংকট নিরসনে কাজ চলছে। গত কয়েক মাসে বেশ কিছু পদোন্নতি হয়েছে। এ সংকট কাটাতে আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যহত রয়েছে।