ইসলামী জীবন বিধান মহান রবের সেরাদান

ইসলামী জীবন বিধান মহান রবের সেরাদান

ছবিঃ সংগৃহীত।

(পূর্বে প্রকাশিতের পর)

প্রকৃতপক্ষে দু’টি বিপরীত বস্তু দেহ ও মনের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। দেহ মাটির তৈরি। আর রূহ বা আত্মা আল্লাহর হুকুম বা নূরের তৈরি। মাটি নিম্নগামী আর রূহ ঊর্ধ্বগামী। মাটির বৈশিষ্ট্য যখন মানুষের মধ্যে প্রবল হয়, তখন সে মনুষ্যত্বটুকুও হারিয়ে ফেলে; বরং চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে রূহানি শক্তি যখন তার মধ্যে প্রবল হয়, তখন সে মারেফতে এলাহি অর্জনে সক্ষম হয়। এমনকি উৎকর্ষের বিচারে ফেরেশতাকুলকেও ছাড়িয়ে যায়। মানুষ পশু নয়, নয় ফেরেশতা। পশুসুলভ গুণ ও ফেরেশতাসুলভ স্বভাবের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। এ দুয়ের দ্বন্দ্বও চিরন্তন। মুসলিম দার্শনিক শাহ ওয়ালি উল্লাহ রহ.-এর মতে, ‘যখন প্রবল পশুসুলভ গুণ ফেরেশতাসুলভ গুণ প্রকাশের পথে বাধা দেয়, তখন তাকে গুরুত্ব দিয়ে অবদমিত করা জরুরি। আর পশুসুলভ গুণের প্রাবল্য, উন্নতি ও ক্রমবৃদ্ধি ঘটে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে। তাই পশুত্ব অবদমনে এই উপকরণগুলো সঙ্কোচনের বিকল্প নেই।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, খ–২, পৃষ্ঠা-৪৮)

সাধারণ অবকাশ বাতিল করে সবলদের ওপর রোজার অপরিহার্যতা
মানুষ যখন রোজা রাখতে অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন আর সাধারণ অবকাশ বাকি থাকেনি। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন- ‘তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা এই মাসে যেন রোজা রাখে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৫)

এ নির্দেশ দ্বারা প্রথম পর্যায়ে উল্লিখিত অবকাশমূলক নির্দেশ সুস্থ-সবল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রহিত হয়ে যায়। তবে যেসব ব্যক্তি অতিরিক্ত বার্ধক্যজনিত কারণে রোজা রাখতে অক্ষম কিংবা দীর্ঘকাল রোগ ভোগের দরুন দুর্বল হয়ে পড়েছে অথবা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত এবং স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে একেবারেই নিরাশ হয়ে পড়েছে, সেই সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে অবকাশমূলক নির্দেশটি এখনো প্রযোজ্য। (জাসসাস, মাজহারি) সহিহ বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে, যখন ‘ওয়াআলাল্লাযিনা ইউতিকুনাহু’ (যারা রোজা রাখতে সক্ষম) শীর্ষক আয়াতটি নাজিল হয়, তখন এই মর্মে এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল যে, যার ইচ্ছা সে রোজা রাখতে পারে, আর যে রোজা রাখতে না চায়, সে ফিদিয়া দিয়ে দেবে। তারপর যখন ‘ফামান শাহিদা মিনকুমুুশ শাহরা ফাল ইয়াসুমহু’ (যে ব্যক্তি রমজান মাস পায়, সে যেন রোজা রাখে) নাজিল হলো, তখন রোজা অথবা ফিদিয়া দেয়ার এখতিয়ার রহিত হয়ে যায় এবং সুস্থ-সামর্থ্যবান লোকদের ওপর রোজা অপরিহার্য সাব্যস্ত হয়ে যায়। (মাআরিফুল কুরআন)

রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে রোজা কেমন ছিল : পবিত্র মাহে রমজানের রোজা ইসলামের মৌলিক বিধানাবলির অন্যতম। তাই রোজা পালনে পদ্ধতিগত ভিন্নতা থাকলেও মৌলিক রোজার বিধান পূর্ববর্তী সব যুগের সব নবীর শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তায়ালা হজরত আদম আ:-কে সৃষ্টি করার পর তাঁকে একটি বিশেষ ফল আহার করতে বারণ করেছেন, এটিই মানব ইতিহাসের প্রথম সিয়াম সাধনা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি ও তোমার সঙ্গী জান্নাতে বাস করতে থাকো এবং যেখান থেকে যা চাও, তা তোমরা খাও, কিন্তু এই গাছটির কাছেও যেয়ো না।’ (সূরা আরাফ, আয়াত-১৯) কিন্তু শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে তাঁরা সেই নিষিদ্ধ ফল আহার করে ফেলেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা তাঁদের দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেন। সেই রোজা ভাঙার কাফ্ফারাস্বরূপ আদম আ: ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন। আর ওই নিষিদ্ধ ফলের প্রভাব আদম আ:-এর পেটে ৩০ দিন বিদ্যমান ছিল বলে আদম আ:-এর শ্রেষ্ঠ সন্তান মুহাম্মদ সা:-এর উম্মতকে মহান আল্লাহ এক মাস রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

হজরত মুসা আ:-ও ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। তুর পাহাড়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা তাকে আরো অতিরিক্ত ১০টি রোজা রাখার আদেশ দেন। ফলে তার রোজা হয়েছিল ৪০ দিন। হজরত ঈসা আ: ও মুসা আ:-এর মতো ৪০ দিন রোজা রাখতেন। হজরত ঈসা আ:-এর জন্মের পর আল্লাহ তায়ালা হজরত মরিয়ম আ:-কে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে সেটি ছিল মৌখিক রোজা। হজরত ইদরিস আ: গোটা জীবন রোজা রেখেছিলেন। হজরত দাউদ আ: একদিন পরপর অর্থাৎ বছরে ছয় মাস রোজা রাখতেন। হজরত নূহ আ:-এর যুগে প্রতি মাসে তিনটি রোজা পালনের বিধান ছিল। তাফসিরবিদ হজরত কাতাদা রহ. বলেন, ‘মাসে তিন দিন রোজা রাখার বিধান হজরত নুহ আ:-এর যুগ থেকে শুরু করে রাসূলুল্লাহ সা:-এর যুগ পর্যন্ত বলবৎ ছিল।’ এক বর্ণনা অনুযায়ী, ‘হজরত নূহ আ: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন বাদ দিয়ে সারা বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবনে মাজাহ) এ ছাড়া বর্তমানে প্রচলিত ধর্মগুলোতেও বিভিন্ন সংযম, উপবাসপ্রথা দেখা যায়।

রমজান কুরআন নাজিলের বার্ষিকী : ইরশাদ হয়েছে- ‘রমজান হলো সেই মাস, যাতে কুরআন নাজিল হয়েছে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৫) রমজান হলো কুরআন নাজিল হওয়ার বার্ষিকী। কুরআন নাজিল হওয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ মাসে ঘটেছে বলেই দীর্ঘ এক মাস ধরে এর বার্ষিকী পালন করা হয়। এই বার্ষিকী পালনের জন্য যেসব অনুষ্ঠান রাখা হয়েছে, তার সামষ্টিক ফল হলো তাকওয়া। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে হজরত ওয়াসেলা ইবনে আসকা থেকে বর্ণিত আছে যে- মহানবী সা: বলেছেন, ‘হজরত ইবরাহিম আ:-এর সহিফা পয়লা রমজান, তাওরাত ছয় রমজান, জাবুর ১২ রমজান, ইঞ্জিল ১৩ মতান্তরে ১৮ রমজান এবং কুরআন মাজিদ ২৪ রমজান নাজিল হয়। (ইবনে কাসির)

অনুশোচনাকারীর জন্য স্থায়ী অবকাশ : রোজার মাহাত্ম্য ও মর্যাদা জ্ঞাত ব্যক্তি যখন পীড়া ও সফরের কারণে রোজা পালন করতে পারে না, তখন তার অন্তরে এ অনুশোচনা সৃষ্টি হয় যে আমি আল্লাহর হুকুম পালন করতে পারিনি এবং রোজার অমূল্য বরকত ও রহমত থেকে বি ত হয়েছি। আল্লাহ তায়ালা বান্দার এ অনুশোচনা ও দুঃখ দূরীভূত করার জন্য এই সহজ পন্থার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন যে তোমরা অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করতে পারবে এবং আল্লাহর হুকুম পালনের সৌভাগ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা-কুমিল্লা জিলা মাদরাসা।
খতিব, প্রাবন্ধিক, টিভি উপস্থাপক।