ভূমিকম্পে দোয়া মনে না এলে যে তিন শব্দ যথেষ্ট
ফাইল ফটো
ভূমিকম্প মানুষের অসহায়ত্বের এক জীবন্ত স্মারক। মুহূর্তের মধ্যে সুদৃঢ় ভবন কেঁপে ওঠে, নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়ে, হৃদয়ে ভর করে তীব্র আতঙ্ক। এমন পরিস্থিতিতে ইসলাম আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, তাঁর স্মরণে মনোনিবেশ করা এবং তওবা-ইস্তিগফারের শিক্ষা দেয়।
ভূমিকম্পের জন্য কি নির্দিষ্ট কোনো দোয়া আছে?
হাদিসের কিতাবগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভূমিকম্পের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সহিহ দোয়া রাসুলুল্লাহ (স.) থেকে বর্ণিত হয়নি। তবে কোরআন-সুন্নাহে বিপদ, ভয় ও সংকটের সময় আল্লাহর জিকির, দোয়া, ইস্তেগফার ও তওবার প্রতি বারবার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
দোয়া মনে না এলে যা পড়বেন
ভূমিকম্পের মতো আকস্মিক দুর্যোগে দীর্ঘ দোয়া মনে না-ও আসতে পারে। এমন মুহূর্তে আল্লাহর সাধারণ জিকিরগুলোই একজন মুমিনের জন্য বড় আশ্রয় হতে পারে।
আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ): এই জিকির মনে করিয়ে দেয়, সমগ্র বিশ্বজগতের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র তাঁর হাতে।
সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত): এই জিকিরের মর্মার্থ- তিনি সব দুর্বলতা, ত্রুটি ও অসহায়ত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
আস্তাগফিরুল্লাহ (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই): বিপদের সময় ইস্তেগফার একজন বান্দাকে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
এ ছাড়াও পড়া যায়- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) এবং হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক)।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি- এগুলোর কোনোটিকে ‘ভূমিকম্পের বিশেষ সুন্নাহ’ বা ‘মাসনুন জিকির’ বলা যাবে না। এগুলো ইসলামের সাধারণ জিকির, যা যেকোনো বিপদ ও সংকটের সময় পড়া যায়।
বিপদে কোরআন-হাদিসের দোয়া
হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়া: لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন। অর্থ: ‘আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র-মহিমান্বিত; নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আম্বিয়া: ৮৭)
নিরাপত্তার দোয়া: بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মা'আসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামাই, ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম। অর্থ: ‘আল্লাহর নামে, যার নামের বরকতে আকাশ ও পৃথিবীর কোনো কিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৮৮; সুনানে তিরমিজি: ৩৩৮৮)
ধসে চাপা পড়া ও দুর্ঘটনা থেকে আশ্রয়ের দোয়া: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَدْمِ وَالتَّرَدِّي وَالْغَرَقِ وَالْحَرَقِ وَالْهَرَمِ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ধসে চাপা পড়া, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, ডুবে যাওয়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া এবং বার্ধক্যজনিত অসহায়ত্ব থেকে আশ্রয় চাই।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৫২)
উল্লেখ্য, এসব দোয়া ভূমিকম্পের জন্য নির্দিষ্ট মাসনুন দোয়া নয়; বরং বিপদ, অনিষ্ট ও দুর্ঘটনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও সাহায্য চাওয়ার দোয়া।
ইস্তেগফার ও তওবার গুরুত্ব
সলফে সালেহিনের জীবন থেকে জানা যায়, দুর্যোগের সময় তাঁরা তওবা ও ইস্তিগফারে মনোনিবেশ করতেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করবে, ততক্ষণ আল্লাহ তাদের ওপর আজাব দেবেন না।’ (সুরা আনফাল: ৩৩)
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল; আর অনেক কিছু তিনি ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা: ৩০)
তাই ভূমিকম্পের সময় একজন মুমিনের জন্য প্রশংসনীয় আমল হলো- আল্লাহর জিকির করা, ইস্তেগফার করা, তওবা করা, দান-সদকা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করাও ইসলামের শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত থাকা নয়।
আতঙ্ক নয়, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন
ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রকৃত ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাই এ সময় গুজব ছড়ানো, আতঙ্ক সৃষ্টি করা বা কোনো ব্যক্তি কিংবা জাতিকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর গজবগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করার পরিবর্তে আত্মসমালোচনা, তওবা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই একজন মুমিনের পথ।