মসজিদে একত্রিত হয়ে নামাজ পড়ার সুফল

মসজিদে একত্রিত হয়ে নামাজ পড়ার সুফল

ছবিঃ সংগৃহীত

মহান আল্লাহ জ্ঞানবান ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান নর-নারীর ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে নবীজি (সা.) সাহাবিদের নিয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করার কারণে পুরুষদের জন্য তা ওয়াজিবের কাছাকাছি পর্যায়ের সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। 

একাকীভাবে নামাজ পড়লে নামাজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু জামাত তরক করার কুপ্রভাব পড়বে জীবনের সব ক্ষেত্রে। জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়লে খুশু-খুজু সহকারে নামাজ আদায় করা সহজ হয়, মুসলমানদের ঐক্য, সংহতি ও শৃঙ্খলার সুন্দর রূপটি ফুটে ওঠে। পক্ষান্তরে এককভাবে নামাজ পড়লে এগুলো আড়ালে থেকে যায়। তাই জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়ার অতিশয় গুরুত্ব রয়েছে।

বড় জামাত পছন্দনীয়

আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার চেষ্টা করি। অবশ্য কোনো কোনো নামাজের জামাত মাঝে মাঝে ছুটে যায়। ফলে কোনো ওয়াক্তের জামাতে লোকসংখ্যা

বেশি হয়। আবার কোনো ওয়াক্তের জামাতে লোকসংখ্যা কম হয়। 

তবে আল্লাহ তায়ালার কাছে অধিক পছন্দনীয় জামাত হলো সেই জামাত-যার লোকসংখ্যা বেশি। হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করার পর বললেন, অমুক হাজির আছে কি? সাহাবিগণ বললেন, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এ দুই ওয়াক্ত (ফজর ও এশা) নামাজই মুনাফিকদের জন্য বেশি ভারী। তোমরা যদি এ দুই ওয়াক্ত নামাজে কী পরিমাণ পুণ্য রয়েছে তা জানতে, তা হলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও অবশ্যই এতে শামিল হতে। জামাতের প্রথম কাতার ফেরেশতাদের কাতারের সমতুল্য। তোমরা যদি এর মর্যাদা সম্পর্কে জানতে, তা হলে অবশ্যই এ জন্য প্রতিযোগিতা করতে। নিশ্চয় দুই জনের জামাত একাকী নামাজ আদায়ের চেয়ে উত্তম। তিনজনের জামাত দুজনের জামাতের চেয়ে উত্তম। জামাতে লোকসংখ্যা যত বেশি হবে মহান আল্লাহর কাছে তা ততই বেশি পছন্দনীয়।’ (আবু দাউদ : ৫৫৪)

অধিক পুণ্য লাভ

পরকালে অর্থবিত্ত, ধন-দৌলত, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও স্ত্রী-সন্তান কোনো কাজে আসবে না। কাজে আসবে কেবল নেক আমল ও সেগুলোর সওয়াব। অতএব, যে আমলের সওয়াব বেশি তার গুরুত্বও নিশ্চয়ই বেশি। নামাজ এমন একটি নেক আমল যা একাকীভাবে আদায় করলে একগুণ সওয়াব পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে জামাতের সঙ্গে আদায় করলে এক বর্ণনা অনুযায়ী পঁচিশগুণ ও অন্য বর্ণনা অনুযায়ী সাতাশগুণ সওয়াব অর্জিত হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, জামাতে নামাজ আদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব একাকী আদায়কৃত নামাজ অপেক্ষা সাতাশ গুণ বেশি।’ (বুখারি : ৬৪৫)

শয়তানের আধিপত্য দমন

শয়তান মানুষের চিরশত্রু। পবিত্র কুরআনে তাকে ‘প্রকাশ্য শত্রু’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। শয়তান জান্নাত থেকে বের হওয়ার সময় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল যে, ‘আমি সকল মানুষকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করে ছাড়ব।’ এই চিরশত্রু শয়তান যদি কারও ওপর প্রবল হয়ে যায়, তা হলে নিশ্চয়ই তার ভাগ্যে কল্যাণ নেই। যেসব পুরুষ জামাত ছেড়ে একাকীভাবে নামাজ আদায় করে তাদের ওপর শয়তান প্রবল হয়ে যায় ও আধিপত্য বিস্তার করে। হজরত আবু দারদা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কোনো জনপদে বা বনজঙ্গলে তিনজন লোক একত্রে বসবাস করা সত্ত্বেও যদি তারা জামাতে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা না করে, তা হলে তাদের ওপর শয়তান আধিপত্য বিস্তার করে। অতএব, তোমরা জামাতকে আঁকড়ে ধরো। কারণ নেকড়ে দলচ্যুত বকরিটিকেই খেয়ে থাকে।’ (আবু দাউদ : ৫৪৭)

দিনরাত ইবাদতে কাটানোর সওয়াব

অধিক পরিমাণে ইবাদত করার সুযোগ অনেক সময় আমরা পাই না কিংবা পেলেও শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে সময়-সুযোগ হাতছাড়া করে ফেলি। ইবাদত বন্দেগি করার মাধ্যমে সময় কাজে লাগাই না। আমাদের মতো অলস বান্দাদের জন্য এটা অবশ্যই সুবর্ণ সুযোগ যে, এশার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করলে অর্ধরাত পর্যন্ত ইবাদত করার সওয়াব পাওয়া যাবে এবং ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করলে বাকি অর্ধরাত ইবাদতে কাটানোর সওয়াব অর্জিত হবে। উসমান ইবনে আফফান (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এশার নামাজ জামাতে আদায় করল, সে যেন অর্ধরাত ইবাদতে কাটাল। আর যে ব্যক্তি এশা ও ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করল, সে যেন সারারাতই ইবাদতে কাটাল।’ (আবু দাউদ : ৫৫৫)

জাহান্নাম ও মুনাফিকি থেকে মুক্তি

জাহান্নাম এক ভয়, আতঙ্ক ও বিভীষিকার নাম। জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আর মুনাফিকি হলো কপটতার নাম। একটি বিষয়কে ভেতরে একরকম পোষণ করে বাইরে অন্যরকম প্রকাশ করার নাম। এমনটি করা কোনো ভদ্র মানুষের কাজ হতে পারে না। নিয়মিতভাবে প্রথম তাকবিরের সঙ্গে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করে জাহান্নাম ও মুনাফিকি হতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তোষ অর্জনের উদ্দেশ্যে একাধারে চল্লিশ দিন তাকবিরে উলার সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করতে পারলে তাকে দুটি মুক্তির ছাড়পত্র দেওয়া হয়। জাহান্নাম হতে মুক্তি ও মুনাফিকি হতে মুক্তি।’ (তিরমিজি : ২৪১)।

শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগ

চকবাজার, ঢাকা