সহযোগিতাও ইবাদত, কিন্তু শর্ত আছে
ছবি: সংগৃহীত
দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানা কাজে একে অপরের সহযোগিতা করি। কিন্তু ইসলামে সব ধরনের সহযোগিতা সমানভাবে সমর্থিত নয়। ইসলামে পারস্পরিক সহযোগিতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হলেও কী ধরনের কাজে সহযোগিতা করা হচ্ছে তা নির্ধারণে কোরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট দিকনির্দেশনা অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন আলেমরা।
সুরা মায়েদার ২ নং আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে ইসলামি স্কলাররা বলছেন, ‘তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়াতে একে অপরের সহযোগিতা করো এবং পাপ ও শত্রুতার কাজে সহযোগিতা করো না’ এই মূলনীতিকে সামাজিক ও দাম্পত্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সহযোগিতার ইসলামি মানদণ্ড
বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, সহযোগিতা করার আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি:
- কর্মের প্রকৃতি: কাজটি হালাল না হারাম তা যাচাই করা
- নিয়ত: সহযোগিতার পেছনে নিয়ত শুদ্ধ হওয়া
- পদ্ধতি: কাজটি শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে করা
নেক কাজে সহযোগিতার পুরস্কার
হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় নেক কাজে সহযোগিতার ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমানতদার মুসলিম খাজাঞ্চি যদি মালিকের আদেশ পালন করে অর্থাৎ যা তাকে প্রদান করতে বলা হয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে ও সন্তুষ্ট চিত্তে প্রদান করে তবে সেও সদকাকারী হিসেবে গণ্য হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১/৩২৯)
সুনানে তিরমিজিতে এসেছে, ‘আল্লাহ তাআলা একটি তীরের বদৌলতে তিন জনকে জান্নাতে দাখিল করবেন: তীরের কারিগরকে, যে তা ছওয়াবের আশায় প্রস্তুত করে; তীর নিক্ষেপকারীকে এবং তীর প্রদানকারীকে।’ (সুনানে তিরমিজি: ১/২৯৩)
ভুল কাজে সহযোগিতা নয়
মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ আজাব প্রদানে কঠোর।’ (সুরা মায়েদা: ২)
গুনাহের কাজে সহযোগিতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এতে আমলনামায় বহুগুণে গুনাহ যোগ হতে থাকে, সহযোগিতার কারণে যদি কোনো গুনাহর প্রচলন ঘটে যায়, তাহলে মানুষ যতদিন সে গুনাহে লিপ্ত থাকবে, সাহায্যকারী ততদিন গুনাহে লিপ্ত সব মানুষের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহের ভাগীদার হবে। রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, যে ব্যক্তি হেদায়েতের দিকে ডাকে, সে তার অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে এবং তাতে তার অনুসারীদের পুরস্কারে কোনোরূপ ঘাটতি হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করে, তার জন্য তার অনুসারীদের সমপরিমাণ গুনাহ হয় এবং এতে তার অনুসারীদের পাপের বোঝা কিছুমাত্র কমবে না।’ (ইবনে মাজাহ: ২০৬)
আল্লামা শাববির আহমদ উসমানি (রহ.) তার তাফসিরে উল্লেখ করেন, ‘শত্রুতা যতই প্রচন্ডতর হোক তার কারণে তোমরা যেন সীমালঙ্ঘন না করে ফেল এবং ন্যায়-নীতি বিসর্জন না দাও।’ (তাফসিরে উসমানি: ১/৪৮৭-৪৮৮)
বাস্তব জীবনে প্রয়োগ
দৈনন্দিন জীবনে ভালো কাজে সহযোগিতা—এই নীতির প্রয়োগ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন-
- পারিবারিক পর্যায়ে সৎকাজে সহযোগিতা
- সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ
- ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ
- অসুস্থ ও বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করা
অতএব, আমাদের সবার দায়িত্ব নেক কাজে সহযোগিতা করা এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাউকে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকা। আর সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রিয়তা, আঞ্চলিকতা বা গোত্রপ্রীতির স্থান নেই। ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কোরআন-হাদিসের এই নির্দেশনা মুসলিম সমাজের জন্য পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং মুমিনের কর্তব্য হলো সর্বদা সৎকাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং পাপকাজে সহযোগিতা থেকে দূরে থাকা