জানাজার নামাজ পড়লে আল্লাহ যা দেন

জানাজার নামাজ পড়লে আল্লাহ যা দেন

ছবি: সংগৃহীত

জানাজার নামাজ এক অনন্য ইবাদত, যা জীবিতের পক্ষ থেকে মৃত মুসলমানের প্রতি সর্বশেষ দায়িত্ব ও ভালোবাসার প্রকাশ। ইসলাম এ নামাজকে শুধু দোয়া নয়, বরং মুসলিম সমাজের এক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। কোনো মুসলমান মারা গেলে তার জানাজার নামাজ আদায় করা ফরজে কিফায়া; অর্থাৎ, কিছু মানুষ আদায় করলে দায়িত্ব থেকে অন্যরা মুক্ত, তবে অংশগ্রহণ করা প্রত্যেকের জন্যই বরকতময় সুন্নত।

জানাজা আদায়ের অপরিসীম সওয়াব

সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃতের জন্য সালাত আদায় করা পর্যন্ত জানাজায় উপস্থিত থাকবে, তার জন্য এক কিরাত, আর যে ব্যক্তি মৃতের দাফন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে তার জন্য দুই কিরাত। জিজ্ঞাসা করা হলো দুই কিরাত কী? তিনি বললেন, দুটি বিশাল পর্বত সমতুল্য (সওয়াব)।’ (সহিহ বুখারি: ১৩২৫)

এ এক অমূল্য পুরস্কার; একটি জানাজায় অংশ নিয়ে মানুষ অর্জন করতে পারে বিশাল পর্বতের সমান নেকি! তবুও আজ অনেকেই এই সহজ অথচ মহান ইবাদত থেকে দূরে সরে গেছেন।

মৃত মুসলমানের অধিকার: জানাজায় অংশগ্রহণ

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের ছয়টি অধিকার রয়েছে- ১. সাক্ষাতে সালাম দেওয়া, ২. দাওয়াতে সাড়া দেওয়া, ৩. পরামর্শ চাইলে সত্য পরামর্শ দেওয়া, ৪. হাঁচি দিলে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা, ৫️. অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া,
৬️. মৃত্যুবরণ করলে জানাজায় অংশ নেওয়া।’ (সহিহ মুসলিম: ৫৪৬৬)

এ হাদিস থেকে স্পষ্ট- জানাজায় অংশগ্রহণ কেবল কর্তব্য নয়, এটি উম্মতের ঐক্যেরও প্রতীক।

জানাজার পর নবীজির (স.) নির্দেশনা

উসমান (রা.) বর্ণনা করেন, ‘নবী করিম (স.) দাফন শেষে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহর কাছে দোয়া করো যেন তিনি তাকে ঈমানের ওপর দৃঢ় রাখেন; কারণ এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে।’ (আবু দাউদ: ৩২২১)

এই দোয়ার মাধ্যমে আমরা মৃতের প্রতি করুণা ও মানবিক দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করি।

চার ইবাদতে নিশ্চিত জান্নাত

একদিন রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন- তোমাদের মধ্যে আজ কে সিয়ামরত ছিলে? আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আজ জানাজায় শরিক হয়েছ? আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আজ দরিদ্রকে আহার দিয়েছ? আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। তিনি বললেন, আজ তোমাদের কেউ কোনো অসুস্থকে দেখতে গিয়েছ? আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, এ কাজগুলো যদি কোনো মানুষের মধ্যে একত্রিত হয়, তাহলে সে ব্যক্তি অবশ্যই জান্নাতি হবেন। (সহিহ মুসলিম: ২/৭১৩, হাদিস: ১০২৮, কিতাবুজ জাকাত)

তাই জানাজায় অংশগ্রহণ শুধু ইবাদত নয়, এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির এক মহাসুযোগ।

পাপাচারী মুসলমানের জানাজা

ইসলাম মৃতের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখে; এমনকি পাপী মুসলমানেরও। নবীজির (স.) আদেশ অনুযায়ী, নামাজ না পড়া, ঋণগ্রস্ত বা আত্মহত্যাকারী মুসলমানেরও জানাজা পড়তে হবে। তবে নেতৃত্বস্থানীয় আলেম বা সমাজনেতারা চাইলে শাস্তিস্বরূপ এমন জানাজায় অংশ না নেওয়ার সুযোগ রাখেন। (ফতোয়া মাহমুদিয়া, খণ্ড ৮)

জানাজার নামাজ শুধু মৃত্যুর পরের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জীবিতদের জন্যও এক বড় শিক্ষা যে, মৃত্যুর পরও সম্পর্ক, ভালোবাসা ও দোয়ার বন্ধন যেন না ছিন্ন হয়। এ নামাজে অংশগ্রহণ মানে হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি, পাহাড়সম সওয়াব, আর পরকালের জন্য অনন্ত পাথেয় অর্জন করা।