ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রার ৪৭ বছর

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রার ৪৭ বছর

ছবি: সংগৃহীত

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) দেশের অন্যতম প্রখ্যাত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে নৈতিক ও মানবিকভাবে গুণসম্পন্ন শিক্ষার্থী তৈরি করা। চার দশক অতিক্রান্ত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা, ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থান বজায় রেখেছে।

প্রতিষ্ঠার সূচনা ও পরিকল্পনা:

১৯৭৭ সালে সাত সদস্যবিশিষ্ট ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এম. এ. বারী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। একই বছরের মক্কায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামী শিক্ষা সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় এশিয়ার তিনটি মুসলিম দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে, যার ফলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়।

১৯৭৯ সালে ড. এ.এন.এম মমতাজ উদ্দীন চৌধুরীকে প্রকল্প পরিচালক নিযুক্ত করা হয় এবং ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহের শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৮০ সালে জাতীয় সংসদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৮০ পাস হয়, এবং ১৯৮১ সালে ড. মমতাজ উদ্দীন চৌধুরী প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

প্রাথমিক কাঠামো ও স্থাপত্য উন্নয়ন:

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে গাজীপুরে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৮২ সালে প্রথম আবাসিক ছাত্রহলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালে কুষ্টিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় স্থানান্তরিত হয়। মূল ক্যাম্পাসে ১৯৯২ সালে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। আজ এখানে ১৭৫ একর জমিতে আধুনিক শিক্ষার জন্য উপযোগী আবাসিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষামূলক সুবিধা রয়েছে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন (৩য় পর্যায়) ১ম সংশোধিত’ প্রকল্পের আওতায় নতুন দশতলা ভবন, কেন্দ্রীয় গবেষণাগার, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, নলকূপ, সোলার প্যানেল ও রেইন ওয়াটার হারভেস্ট প্লান্ট নির্মাণ চলছে। প্রকল্পের ৩২টি অঙ্গের মধ্যে ১৭টি সমাপ্ত হয়েছে এবং বাকি ১৫টি কাজ চলমান।

অ্যাকাডেমিক অগ্রগতি ও বিভাগীয় বিস্তার:

আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি অনুষদে ৩৬টি বিভাগে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৯,৮৯৭। এরমধ্যে ছাত্র ১২,৩১২ এবং ছাত্রী ৭,৫৮৫। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নতুন ভর্তি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২,৪৪৮। বিদেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে ১৮ জন, যার মধ্যে ১৫ জন ছাত্র এবং ৩ জন ছাত্রী। শিক্ষকদের সংখ্যা ৪১১ জন এবং প্রশাসনিক স্টাফ ৭২৫ জন।

ইবি এ পর্যন্ত ৭৪৯ জনকে পিএইচডি এবং ৮৫৫ জনকে এমফিল ডিগ্রি প্রদান করেছে। বর্তমানে গবেষণায় নিয়োজিত আছেন পিএইচডি ১২৫ জন এবং এমফিল ১০২ জন।

গবেষণা ও পিএইচডি/এমফিল কার্যক্রম:

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিতভাবে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পের আয়োজন করে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার মাধ্যমে পিএইচডি ও এমফিল ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাশাপাশি বিদেশি ও জাতীয় গবেষকরা যৌথ গবেষণায় অংশগ্রহণ করছেন। এ কার্যক্রম শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বর্তমান ভিসি : প্রফেসর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ

প্রফেসর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ ২০২৪ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষার মান উন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

ভিসি হিসেবে তার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষক-ছাত্র বিনিময়, কারিকুলাম উন্নয়ন এবং যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি শিক্ষার্থী কল্যাণ, ক্রীড়া, গবেষণা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমঝোতা স্মারক:

ইবির নেতৃত্বে তুরস্ক, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে MoU সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক-ছাত্র বিনিময়, একাডেমিক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং গবেষণা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সেশনজট হ্রাস ও শিক্ষাবান্ধব প্রশাসন:

ইবি সেশনজটমুক্ত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরীক্ষা ও প্রশাসনিক উন্নয়ন করছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসটি নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হওয়ায় সেবা আরও উন্নত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে সহায়তা করছে।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও ডিজিটাল সুবিধা:

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বইয়ের সংখ্যা ১,৩০,২১৭ এবং জার্নাল, ম্যাগাজিন ও নিউজপেপার ১৯,৫৯৩। রিমোট এক্সেসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ই-বুক ও ই-জার্নাল পড়তে পারে। গ্রন্থাগারের ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমও চলছে।

ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক সাফল্য:

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। মো. শামসুদ্দীন ২০০৪ সালে অলিম্পিকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফাহিমা খাতুন জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের নিয়মিত খেলোয়াড়। তামান্না আক্তার ১০০ মিটার হাডলসে সাতবার জাতীয় স্বর্ণপদক জিতেছেন। ছাত্র ও ছাত্রীরা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ান হয়েছে এবং ফুটবল, হ্যান্ডবল, ভলিবল, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টনে বিভিন্ন ট্রফি জিতেছে।

পরিবহন ও যোগাযোগ সুবিধা:

শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গাড়ি ৪৬টি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়াকৃত ১৩টি দ্বিতল বাসসহ মোট ৩৩টি যানবাহন ব্যবহৃত হচ্ছে।

সমাবর্তন ও শিক্ষাবান্ধব কার্যক্রম:

ইবিতে এ পর্যন্ত চারটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম সমাবর্তন ১৯৯৩ সালে, সর্বশেষ ২০১৮ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উন্নততর শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করছে।

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও লক্ষ্য নিষ্ঠা:

প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান সত্ত্বেও ইবি শিক্ষাবান্ধব, সেশনজটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয় নৈতিক ও মানবিক মানুষ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ মাধ্যমে সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তির বাংলাদেশ গঠনে বিশ্ববিদ্যালয় অবদান রাখছে।

ইবির ভিসি প্রফেসর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসলামিক ও আধুনিক শিক্ষার সংমিশ্রণ ঘটানোর লক্ষ্যেই এই বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করেছিলেন। আমরা সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছি।