কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর (সূরা আল ইমরান # ৫৫ আয়াত)
কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর। নিজস্ব ছবি
তাফসীর হলো আল-কুরআনের আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত শিক্ষা, বিধান ও উদ্দেশ্যের বিশদ ব্যাখ্যা। এর মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর হেদায়েতের আলোতে জীবনকে সাজাতে সক্ষম হয়। মহান রব আমাদেরকে কুরআন বুঝে সে অনুযায়ী চলার সৌভাগ্য দিন।
*** গত সংখ্যায় প্রকাশিতের পর...
সূরা আল ইমরান
৫৫ আয়াত
إِذْ قَالَ ٱللَّهُ يَٰعِيسَىٰٓ إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَىَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَجَاعِلُ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوكَ فَوْقَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓا۟ إِلَىٰ يَوْمِ ٱلْقِيَٰمَةِۖ ثُمَّ إِلَىَّ مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ
৫৫ ) (এটি আল্লাহরই একটি গোপন কৌশল ছিল) যখন তিনি বললেনঃ “হে ঈসা! এখন আমি তোমাকে ফিরিয়ে নেবো ৫১ এবং তোমাকে আমার নিজের দিকে উঠিয়ে নেবো। আর যারা তোমাকে অস্বীকার করেছে তাদের থেকে (অর্থাৎ তাদের সঙ্গ এবং তাদের পূতিগন্ধময় পরিবেশে তাদের সঙ্গে থাকা থেকে) তোমাকে পবিত্র করে দেবো এবং তোমাকে যারা অস্বীকার করেছে ৫২ তাদের ওপর তোমার অনুসারীদের কিয়ামত পর্যন্ত প্রাধান্য দান করবো। তারপর তোমাদের সবাইকে অবশেষে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। সে সময় আমি তোমাদের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোর মীমাংসা করে দেবো।
*** টিকা নির্দেশিকাঃ
৫১.
এখানে কুরআনের মূল শব্দ হচ্ছে, মুতাওয়াফ্ফীকা (مُتَوَفِّيكُ) মূল তাওয়াফ্ফা (تَوَفَّى) শব্দের আসল মানে হচ্ছেঃ নেয়া ও আদায় করা। “প্রাণবায়ু বের করে নেয়া” হচ্ছে এর গৌণ ও পরোক্ষ অর্থ, মূল আভিধানিক অর্থ নয়। এখানে এ শব্দটি ইংরেজী To Recall -এর অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হয়, কোন পদাধিকারীকে তার পদ থেকে ফিরিয়ে ডেকে নেয়া। যেহেতু বনী ইসরাঈল শত শত বছর ধরে অনবরত নাফরমানী করে আসছিল, বার বার উপদেশ দান ও সতর্ক করে দেয়ার পরও তাদের জাতীয় মনোভাব ও আচরণ বিকৃত হয়েই চলছিল, একের পর এক কয়েকজন নবীকে তারা হত্যা করেছিল এবং যেকোন সদাচারী ব্যক্তি তাদেরকে নেকী, সততা ও সৎবৃত্তির দাওয়াত দিতো তাকেই তারা হত্যা করতো। তাই আল্লাহ তাদের মুখ বন্ধ করার ও তাদেরকে শেষবারের মতো সুযোগ দেবার জন্য হযরত ঈসা ও হযরত ইয়াহ্ইয়া আলাইহিস সালামের মতো দু’জন মহান মর্যাদা সম্পন্ন পয়গম্বর পাঠালেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের নিযুক্তির প্রমাণ স্বরূপ তাদের সাথে এমন সব সুস্পষ্ট নিশানী ছিল যেগুলো একমাত্র তারাই অস্বীকার করতে পারতো, যারা ন্যায়, সত্য ও সততার সাথে চরম শত্রুতা পোষণ করতো এবং যাদের সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করার দুঃসাহস ও নির্লজ্জতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু বনী ঈসরাইলরা এই শেষ সুযোগও হাত ছাড়া করেছিল। তারা কেবল এই দু’জন পয়গম্বরের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং এই সঙ্গে তাদের একজন প্রধান ব্যক্তি নিজের নর্তকীর ফরমায়েশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে হযরত ইয়াহ্ইয়া আলাইহিস সালামের শিরচ্ছেদ করেছিল এবং তাদের আলেম ও ফকীহগণ ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করে রোমান শাসকের সাহায্যে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে মৃত্যুদন্ড দেবার চেষ্টা চালিয়েছিল। এরপর আর বনী ইসলাঈলদের উপদেশ দেবার জন্য বেশী সময় ও শক্তি ব্যয় করা ছিল অর্থহীন। তাই মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে ফিরিয়ে নিজের কাছে ডেকে নিলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত বনী ইসলাঈলদের জন্য লিখে দিলেন লাঞ্ছনার জীবন।
— নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।
(সূরা নাহল ১৬:১২৮)
এখানে অবশ্যই একথা অনুধাবন করতে হবে যে, কুরআনের এ সমগ্র ভাষণ আসলে খৃস্টানদের ঈসার খোদা হওয়ার আকীদার প্রতিবাদ ও সংশোধনের উদ্দেশ্যেই ব্যক্ত হয়েছে। খৃস্টানদের মধ্যে এই আকীদার জন্মের মূলে ছিল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণঃ
একঃ হযরত ঈসার অলৌকিক জন্ম।
দুইঃ তাঁর সুস্পষ্ট অনুভূত মুজিযাসমূহ।
তিনঃ তাঁর আকাশের দিকে উঠিয়ে নেয়া। তাদের বই পত্রে পরিষ্কার ভাষায় এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
কুরআন প্রথম কথাটিকে সত্য বলে ঘোষণা করেছে। কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে, হযরত ঈসার (আঃ) পিতা ছাড়াই জন্মগ্রহণ নিছক আল্লাহর কুদরাতের প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ যাকে যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করে থাকেন। এই অস্বাভাবিক জন্মের কারণে একথা প্রমাণ হয় না যে, হযরত ঈসা (আঃ) খোদা ছিলেন বা খোদায়ী কর্তৃত্বে তাঁর কোন অংশীদারীত্ব ছিল।
দ্বিতীয় কথাটিকেও কুরআন সত্য বলে ঘোষণা করেছে। কুরআন হযরত ঈসার মুজিযাগুলো একটি একটি করে গণনা করে বর্ণনা করেছে। কিন্তু এখানে সুস্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে যে, এই সমস্ত কাজই তিনি আল্লাহর হুকুমে সম্পাদন করেছিলেন। তিনি নিজে অথবা নিজের শক্তিতে কিছুই করেননি। কাজেই এগুলোর মধ্য থেকে কোন একটি ভিত্তিতেই এই ফল লাভ করা যেতে পারে না যে, খোদায়ী কর্তৃত্ব ও কার্যকলাপে হযরত ঈসার কোন অংশ ছিল।
এখন তৃতীয় কথাটি সম্পর্কে খৃস্টানদের বর্ণনাগুলো যদি একবারেই ভুল বা মিথ্যা হতো, তাহলে তাদের ঈসার খোদা হবার আকীদাটির প্রতিবাদ করার জন্য পরিষ্কারভাবে একথা বলে দেয়া অপরিহার্য ছিল যে, যাকে তোমরা খোদার পুত্র বা খোদা বলছো সে তো কবে মরে মাটির সাথে মিশে গেছে। আর যদি এজন্য অধিকতর নিশ্চিন্ত হতে চাও, তাহলে উমুক স্থানে গিয়ে তার কবরটি দেখো। কিন্তু একথা না বলে কুরআন কেবল তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারটি অস্পষ্ট রেখেই থেমে যায়নি এবং তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সম্পর্কে কেবল এমন শব্দ ব্যবহার করেনি যার ফলে কমপক্ষে তাঁকে জীবিত উঠিয়ে নেয়ার অর্থের সম্ভাবনা থেকে যায় বরং খৃস্টানদের সুস্পষ্টভাবে একথা বলে দেয় যে, ঈসাকে আদতে শূলে চড়ানোই হয়নি। অর্থাৎ যে ব্যক্তি শেষ সময়ে “এইলী এইলী লিমা শাবাকতানী” (অর্থাৎ ঈশ্বর আমার! কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছো?) বলেছিল এবং যার শুলে চড়াবার দৃশ্যের ছবি নিয়ে তোমরা ঘুরে বেড়াও, সে ঈসা ছিল না। ঈসাকে আল্লাহ তার আগেই উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
এ ধরনের বক্তব্য পেশ করার পর যে ব্যক্তি কুরআনের আয়াত থেকে হযরত ঈসার (আঃ) মৃত্যুর অর্থ বের করার চেষ্টা করে সে আসলে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, আল্লাহ পরিষ্কার ভাষায় নিজের বক্তব্য প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখেন না, নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক।
৫২.
অস্বীকারকারী বলতে এখানে ইহুদীদেরকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তাদেরকে ঈমান আনার দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। বিপরীত পক্ষে তাঁর অনুসারী বলতে যদি সঠিক, যথার্থ নির্ভুল অনুসারী ধরা হয় তাহলে কেবল মুসলমানরাই তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আর যদি এর অর্থ হয় মোটামুটি যারা তাঁকে মেনে নিয়েছিল, তাহলে এর মধ্যে খৃস্টান ও মুসলমান উভয়ই শামিল হবে।
*** চলমান ***
- সংগৃহিত