বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ক্যাডারের 'দখল', শিক্ষকের হাহাকার!

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ক্যাডারের 'দখল', শিক্ষকের হাহাকার!

ফাইল ছবি

শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলছে এক অদ্ভুত নাটক। আমরা যারা মাঠের শিক্ষা নিয়ে ভাবি, তারা অবাক চোখে দেখছি, কিভাবে 'মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর' (মাউশি) ধীরে ধীরে একটি 'শিক্ষা ক্যাডার নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে' রূপান্তরিত হয়েছে। যেখানে কলেজ শিক্ষক স্বল্পতা নিয়ে প্রায়ই হাহাকার শোনা যায়, সেখানে সেই শিক্ষকেরাই এখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসে আছেন মাধ্যমিক শিক্ষার বিশাল সাম্রাজ্যে। সর্বশেষ, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫-এ যে নতুন বিধান যুক্ত করা হলো—বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদেও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ—তাতে নাটকটির ক্লাইম্যাক্স শুরু হয়েছে বলা যায়।

অভিজ্ঞতা বনাম এক্সপেরিমেন্ট: মাধ্যমিক কি খেলার মাঠ?

মাউশির কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে, মাধ্যমিক শিক্ষা কোনো ল্যাবরেটরি নয়, যেখানে কলেজ শিক্ষকরা এসে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করবেন। বাংলাদেশের মোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশাল সংখ্যক, প্রায় ৯৭ শতাংশই, বেসরকারি বা এমপিওভুক্ত। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা বছরের পর বছর ধরে মাটিতে পা রেখে, সামান্য বেতন আর সীমাহীন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছেন। একজন সহকারী শিক্ষক, যিনি ২০ বছর ধরে একটি বিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণা চেনেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীর নাড়ি-নক্ষত্র জানেন, তিনিই প্রতিষ্ঠান প্রধান হওয়ার স্বাভাবিক দাবিদার।

অথচ, নতুন নীতিমালায় কলেজ ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিজেদের 'অভিজ্ঞতা' নামক এক অদৃশ্য ঢাল নিয়ে হাজির হচ্ছেন। কোন অভিজ্ঞতা? সেই অভিজ্ঞতা, যা দিয়ে তারা কলেজ সামলাতে গিয়ে নাকি মাউশিতে 'লেজেগোবরে' অবস্থা তৈরি করেছেন বলে বেসরকারি মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষক নেতারাই প্রশ্ন তুলেছেন?

শিক্ষানীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে কারিকুলাম নির্ধারণ—সবকিছুতেই যখন মাধ্যমিকের শিক্ষকদের বাস্তবিক জ্ঞানকে দূরে সরিয়ে সরকারি কলেজ শিক্ষকেরা বিদেশ ভ্রমণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মহোৎসব চালান, তখন সেই সিদ্ধান্তের ফল হয় বাস্তববিমুখ এবং অনেক ক্ষেত্রেই মাধ্যমিকের জন্য ক্ষতিকর। এটি শুধু বৈষম্য নয়, এটি মাধ্যমিক শিক্ষাকে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করার একটি 'নীল নকশা'।

সোনার ডিম পাড়া প্রতিষ্ঠান: পদায়ন না 'ইনকাম সোর্স'?

বেসরকারি শিক্ষকদের অভিযোগ, মাউশির পদগুলো এখন 'অবৈধ অর্থ উপার্জনের স্বর্গরাজ্য'। আর এখন, নীতিমালা করে সেই স্বর্গরাজ্যের প্রবেশদ্বার আরও প্রশস্ত করা হলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদ পর্যন্ত। নতুন নীতিমালার এই ধারা যেন একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: ভালো ইনকামের সুযোগ আছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আমাদের 'সরকারি সম্পত্তি'।

যদি সরকার মনে করে থাকে, 'সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা'র জন্যই এই পদক্ষেপ, তবে কেন বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার সফল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের শিক্ষকদের নেতৃত্বেই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে? আসল উদ্দেশ্য কি 'সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা', নাকি কায়েমি স্বার্থের সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী করা এবং ভালো ইনকাম সোর্সগুলোতে নিজেদের লোকদের বসিয়ে দেওয়া?

প্রকৃতপক্ষে, এই নীতিমালার মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষায় আরও একটি গভীর বৈষম্যের ফাটল তৈরি করা হলো। যে শিক্ষকেরা তাদের পুরো জীবন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় করলেন, তাদের মাথার উপর ছাতা ধরে এখন এমন কাউকে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ানোর বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।

কলেজ শিক্ষক সমিতির নেতা জাকির আহমেদ খানের হুঁশিয়ারি তাই কেবল ক্ষোভ নয়, এটি একটি জ্বলন্ত সত্যের স্ফুলিঙ্গ। যদি সরকারি কলেজই ঠিকমতো না চলে, তাহলে এই কর্মকর্তারা শতভাগ বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান চালাবেন কী করে? উত্তর সহজ: চালাবেন না, শুধু শাসন করবেন, শোষণ করবেন এবং 'উপরি ইনকাম'-এর পথ সুগম করবেন।

এই বৈষম্য চলবে না:

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উচিত নিজেদের কলেজগুলোতে মনোযোগ দেওয়া, যেগুলোর উন্নয়ন তাদেরই দায়িত্ব। বেসরকারি শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা কমানো বা তাদের অবমূল্যায়ন করে শিক্ষার মান বাড়ানো যায় না।

মাঠের শিক্ষকেরা মানুষ, কর্মচারী নন। তাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান জানাতে হবে। সরকার যদি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন চায়, তবে তাকে মাউশির এই 'একক আধিপত্য ও সিন্ডিকেট' ভেঙে দিতে হবে এবং বেসরকারিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের শিক্ষকদের বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, এই 'নীল নকশা'র বিরুদ্ধে বেসরকারি শিক্ষকেরা যে আন্দোলন গড়ে তুলবেন, তা শিক্ষার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে—যেখানে কায়েমি স্বার্থের শাসন নয়, গুণগত মানের শিক্ষা জয়ী হবে।

লেখক : জাকির হোসাইন, সাংবাদিক।