ঝিনাইদহসহ পাশের জেলাগুলোর সবখানেই অবৈধ অস্ত্রে বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা
প্রতিকী ছবি
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ঝিনাইদহসহ পাশের জেলাগুলোর গ্রাম থেকে শহর সবখানেই যেন এক অদৃশ্য আতঙ্ক। সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সরব উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে উদ্বেগে ফেলেছে।
আধিপত্য বিস্তার, চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, জমি নিয়ে বিরোধ কিংবা রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই বেড়ে গেছে অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা।
প্রশাসন একাধিক বার অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সে সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে দেশি-বিদেশি বেশকিছু আগ্নেয়াস্ত্র।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের উদ্ধার কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে দ্রুতগতিতে অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এ বিষয়ে সজাগ রয়েছেন, আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।
জানা গেছে, ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা ঝিনাইদহের মহেশপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর এলাকার বেশ কয়েকটি অঞ্চল দিয়ে ছোট আকারের দেশি অস্ত্র থেকে শুরু করে ওয়ানশুটার, পাইপগান, এয়ারগান, এমনকি বিদেশি পিস্তল পর্যন্ত চোরা কারবারিদের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে। এসব অস্ত্রের বড় অংশ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাচ্ছে। সেখান থেকে দুষ্কৃতকারী, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও চাঁদাবাজ চক্রের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে।
সূত্র জানায়, মহেশপুর ও জীবননগর এলাকায় অস্থায়ী কয়েকটি লেদ মেশিনের কারখানায় দেশীয় অস্ত্র তৈরির প্রবণতাও সম্প্রতি নজরে এসেছে।
ফলে অল্প খরচে অস্ত্র হাতে পাচ্ছে অপরাধীরা। এতে তাদের দৌরাত্ম্য যেমন বাড়ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের আতঙ্কও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের অসাধু সদস্যদের সহায়তায় তৈরি হচ্ছে এসব আগ্নেয়াস্ত্র। তবে অপরাধচক্রগুলো আগের মতো আর বড় দল নয়, এখন ছোট ছোট দল করে কাজ করছে। তাই তাদের দিকে নজরদারি করা কঠিন হয়ে গেছে।
অনেক সময় অস্ত্র ব্যবহার করে আবার রাতারাতি অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। এতে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে প্রশাসনের। তবে এসব অস্ত্র দিয়ে সন্ত্রাসীরা নির্বাচনের আগে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে তাদের পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে প্রভাব তৈরি করবে।
এদিকে চলতি বছর জেলায় সংঘটিত বেশ কয়েকটি খুন, ছিনতাই ও হামলার ঘটনাতেও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার দেখা গেছে। অনেক এলাকায় দেখা গেছে, সামান্য ব্যক্তিগত বিরোধেও অস্ত্রের মুখে রূপ নিয়েছে ভয়ংকর সংঘর্ষে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শৈলকুপার শেখড়া গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, রাতের আঁধারে আমাদের এলাকায় অপরিচিত অপরাধীদের আনাগোনা বেড়েছে। সন্দেহজনক মোটরসাইকেল চলাচলও চোখে পড়ে। অপরাধীদের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় যে কোনো সময় বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে।
হরিণাকুণ্ডু শহরের এক পোশাক ব্যবসায়ী বলেন, সন্ধ্যা লাগলেই আমরা দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যায়। গত একমাসে এই এলাকায় দুই জায়গায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে মাদক ও অস্ত্র কারবার নিয়ে জড়িত নতুন গোষ্ঠী নিয়ে আমাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এ নিয়ে প্রশাসনকে জানালেও তাঁরা ঘটনাস্থলে আসে না। সব মিলিয়ে আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে সময় পার করছি।
অপরাধ বিশ্লেষক মো. লিয়াকত হোসেন বলেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। সীমান্ত নজরদারি জোরদার, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, সচেতনতা বৃদ্ধি ও অপরাধী চক্রের অর্থায়ন বন্ধ করাটাও জরুরি। একই সঙ্গে অস্ত্রবাজদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার শুধু অপরাধ বাড়াচ্ছে না, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলছে। প্রতিদিনের চলাফেরা, ব্যবসা, শিক্ষাসহ সবকিছুতেই যেন আতঙ্কের ছায়া পড়ছে। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিনগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক কর্নেল রফিকুল আলম বলেন, সীমান্ত সুরক্ষায় আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি। আমাদের একাধিক গোয়েন্দা টিম কাজ করছে। সীমান্তের ওপর থেকে যেন অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। সাধারণ মানুষ যাতে আতঙ্কিত না হয় সেজন্য আমাদের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি এখানে সদ্য যোগদান করেছে। এরপরেও অবৈধ অস্ত্র যাঁরা ব্যবহার করছে তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করব।
তিনি আরো বলেন, সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এ নিয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম কাজ করছে। শিগগিরই জনমনে স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আশা করছি।