সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার দোয়া,আল্লাহর পক্ষ থেকে অনন্য নিয়ামত

সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার দোয়া,আল্লাহর পক্ষ থেকে অনন্য নিয়ামত

প্রতিকী ছবি

মানুষের জীবনযাত্রায় দোয়া এক অনন্য অবলম্বন। এটি শুধু কণ্ঠের আর্তি বা হৃদয়ের আবেদন নয়—দোয়া হলো সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানুষের গভীরতম সংযোগের সেতুবন্ধন। এর মধ্যে সবচেয়ে মহামূল্যবান হলো মাতা-পিতার দোয়া। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, সন্তানের প্রতি তাঁদের দোয়া আল্লাহর কাছে সবচেয়ে দ্রুত কবুল হওয়া দোয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মানব সভ্যতার সব সম্পর্ককে ছাপিয়ে মাতা-পিতা ও সন্তানের সম্পর্ক সবচেয়ে নির্মল, নিঃস্বার্থ ও মমতাময়। তাঁদের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে যে ভালোবাসা ঝরে, তার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে তাঁদের দোয়ায়। সেই দোয়ায় থাকে সন্তানের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের প্রার্থনা—এক আন্তরিক, স্বার্থহীন এবং পবিত্র আবেদন।

হাদিসে নবী মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন—তিন ব্যক্তির দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়: মাতা-পিতার দোয়া, পথিকের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া। (আবু দাউদ ১৫৩৬; তিরমিজি ১৯০৫; ইবনু মাজাহ ৩৮৬২)

"إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ"
— নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।
(সূরা নাহল ১৬:১২৮)

ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনে দোয়ার মাহাত্ম্য সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে। আল্লাহর নির্দেশে যখন তিনি স্ত্রী হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে রেখে যান, তখন তিনি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী দোয়াগুলো উচ্চারণ করেন।

এই দোয়াগুলো শুধু তাঁদের নিরাপত্তা ও জীবিকার জন্য ছিল না—এগুলোই ভবিষ্যৎ মক্কা নগরীর নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি, এবং শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের সুসংবাদ বহন করেছিল।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, হে আমার প্রতিপালক! এ নগরকে নিরাপদ করো এবং এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে, তাদের ফলমূলের রিজিক দান করো। (সুরা বাকারাহ, আয়াত ১২৬)

মক্কা আজ নিরাপদ নগরী এবং অনুর্বর ভূমি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের নানা প্রান্তের ফল-ফসল সেখানে সহজলভ্য—ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়ারই ফল।

ইবরাহিম (আ.) তাঁর বংশে এক মহান ব্যক্তিত্বের আগমনের জন্য দোয়া করেছিলেন। সেই দোয়ারই প্রতিফলন হলেন শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি আমার পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া, ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদ এবং আমার মায়ের দেখা স্বপ্ন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৬২)

কোরআনের সুরা বাকারাহ, আলে-ইমরান ও সুরা জুমুয়ায় ইবরাহিম (আ.)-এর সেই দোয়াগুলো বর্ণিত হয়েছে—যেখানে তিনি এমন এক রাসুল পাঠানোর প্রার্থনা করেন যিনি মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবেন এবং কিতাব-হিকমত শিক্ষা দেবেন।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে এমন কিছু দোয়া শিখিয়েছেন যেগুলো পরিবার, প্রজন্ম এবং নেক আমল নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। এর মধ্যে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো—

১. সুরা ইবরাহিম (৪০): রব্বিজ আলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন জুররিয়্যাতি। রব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুয়া।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে সালাত প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার সন্তানদেরও। হে আমাদের রব! আমার প্রার্থনা গ্রহণ করুন।

২. সুরা ফুরকান (৭৪): রব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইয়ুন, ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্য থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের নেককারদের নেতা বানান।

এগুলো কেবল দোয়া নয়—এগুলো পরিবার গঠন, সন্তানকে নেক-পরায়ণ করার জন্য এক শক্তিশালী দিকনির্দেশনা।

মাতা-পিতার দোয়া সন্তানের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে এক অমূল্য উপহার। এ দোয়া যেমন আন্তরিকতার প্রতীক, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৎ, ঈমানদার, চরিত্রবান ও সালাতপরায়ণ করে তোলার এক বলিষ্ঠ উপায়।

দোয়া শুধু মুহূর্তের আবেদন নয়—এটি প্রজন্ম গড়ার শক্তিশালী অস্ত্র। আল্লাহর রহমত অর্জনের জন্য নিয়মিত দোয়া করা প্রতিটি মাতা-পিতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।