কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর (সূরা আল ইমরান # ৯১ - ৯৩ আয়াত)

কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর (সূরা আল ইমরান # ৯১ - ৯৩ আয়াত)

কুরআনের ধারাবাহিক তাফসীর। নিজস্ব ছবি

তাফসীর হলো আল-কুরআনের আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত শিক্ষা, বিধান ও উদ্দেশ্যের বিশদ ব্যাখ্যা। এর মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর হেদায়েতের আলোতে জীবনকে সাজাতে সক্ষম হয়। মহান রব আমাদেরকে কুরআন বুঝে সে অনুযায়ী চলার সৌভাগ্য দিন।

*** গত সংখ্যায় প্রকাশিতের পর... 

সূরা আল ইমরান

৯১ - ৯৩ আয়াত

Bismillah

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَمَاتُوا۟ وَهُمۡ كُفَّارٞ فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡ أَحَدِهِم مِّلۡءُ ٱلۡأَرۡضِ ذَهَبٗا وَلَوِ ٱفۡتَدَىٰ بِهِۦٓۗ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ وَمَا لَهُم مِّن نَّٰصِرِينَ ⟦٩١⟧

৯১ ) নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, যারা কুফরী অবলম্বন করেছে এবং কুফরীর অবস্থায় জীবন দিয়েছে, তাদের মধ্য থেকে কেউ যদি নিজেকে শাস্তি থেকে বাঁচাবার জন্য সারা পৃথিবীটাকে স্বর্ণে পরিপূর্ণ করে বিনিময় স্বরূপ পেশ করে তাহলেও তা গ্রহণ করা হবে না। এ ধরনের লোকদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এবং তারা নিজেদের জন্য কোন সাহায্যকারীও পাবে না।

لَن تَنَالُوا۟ ٱلۡبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا۟ مِمَّا تُحِبُّونَۚ وَمَا تُنفِقُوا۟ مِن شَيۡءٖ فَإِنَّ ٱللَّهَ بِهِۦ عَلِيمٞ ⟦٩٢⟧

৯২ ) তোমরা নেকী অর্জন করতে পারো না যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলো (আল্লাহ্‌র পথে) ব্যয় করো। ৭৫   আর তোমরা যা ব্যয় করবে আল্লাহ‌ তা থেকে বেখবর থাকবেন না।

كُلُّ ٱلطَّعَامِ كَانَ حِلّٗا لِّبَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسۡرَٰٓءِيلُ عَلَىٰ نَفۡسِهِۦ مِن قَبۡلِ أَن تُنَزَّلَ ٱلتَّوۡرَىٰةُۗ قُلۡ فَأۡتُوا۟ بِٱلتَّوۡرَىٰةِ فَٱتۡلُوهَآ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ⟦٩٣⟧

৯৩ ) এসব খাদ্যবস্তু (শরীয়াতে মুহাম্মাদীতে যেগুলো হালাল) বনী ইসরাঈলদের জন্যও হালাল ছিল। ৭৬   তবে এমন কিছু বস্তু ছিল যেগুলোকে তাওরাত নাযিল হবার পূর্বে বনী ইসরাঈল ৭৭  নিজেই নিজের জন্য হারাম করে নিয়েছিল। তাদেরকে বলে দাও, যদি তোমরা (নিজেদের আপত্তির ব্যাপারে) সত্যবাদী হয়ে থাকো, তাহলে তাওরাত নিয়ে এসো এবং তার কোন বাক্য পেশ করো।

"إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ"
— নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে।
(সূরা নাহল ১৬:১২৮)

*** টিকা নির্দেশিকাঃ

৭৫.

নেকী, সওয়াব ও পুণ্যের ব্যাপারে তারা যে ভুল ধারণা পোষণ করতো, তা দূর করাই এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য। নেকী ও পূণ্য সম্পর্কে তাদের মনে যে ধারণা ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে উন্নত ধারণাটির চেহারা ছিল নিম্নরূপঃ শত শত বছরের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের পথ বেয়ে শরীয়াতের যে একটি বিশেষ আনুষ্ঠানিক চেহারা তাদের সমাজে তৈরি হয়ে গিয়েছিল মানুষ নিজের জীবনে পুরোপুরি তার নকলনবিশী করবে। আর তাদের আলেম সমাজ আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে যে একটি বড় রকমের আইন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল জীবনের ছোটখাটো ও খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলোকে দিনরাত বসে বসে তার মানদণ্ডে বিচার করতে থাকবে। ধার্মিকতার এই আবরণের নীচে সাধারণত ইহুদীদের বড় বড় ‘ধার্মিকেরা’ সংকীর্ণতা, লোভ, লালসা, কার্পণ্য, সত্য গোপন করা ও সত্যকে বিক্রি করার দোষগুলো সঙ্গোপনে লুকিয়ে রেখেছিল। ফলে সাধারণ মানুষ তাদেরকে সৎ ও পুণ্যবান মনে করতো। এ বিভ্রান্তি দূর করার জন্য তাদেরকে বলা হচ্ছেঃ তোমরা যে জিনিসকে কল্যাণ, সততা ও সৎকর্মশীলতা মনে করছো ‘সৎলোক’ হওয়া তার চেয়ে অনেক বড় ব্যাপার। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসাই হচ্ছে নেকীর মূল প্রাণসত্তা। এই ভালোবাসা এমন পর্যায়ে পৌঁছতে হবে, যার ফলে আল্লাহর সন্তুষ্টির মোকাবিলায় মানুষ দুনিয়ার কোন জিনিসকেই প্রিয়তর মনে করবে না। যে জিনিসের প্রতি ভালোবাসা মানুষের মনে এমনভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে যে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার জন্য সে তাকে ত্যাগ করতে পারে না, সেটিই হচ্ছে একটি দেবতা। এই দেবতাকে বিসর্জন দিতে ও বিনষ্ট করতে না পারলে নেকীর দুয়ার তার জন্য বন্ধ থাকবে। এই প্রাণসত্তা শূণ্য হবার পর নেকী নিছক বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান ভিত্তিক ধার্মিকতায় পরিণত হয় এবং তাকে তখন এমন একটি চকচকে তেলের সাথে তুলনা করা যায়, যা একটি ঘুণে ধরা কাঠের গায়ে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের তেল চকচকে কাঠ দেখে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে, আল্লাহ‌ নয়।

৭৬.

ইহুদী আলেমরা কুরআন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষার বিরুদ্ধে যখন কোন নীতিগত আপত্তি জানাতে পারলো না (কারণ যেসব বিষয়ের ওপর দ্বীনের ভিত্তি স্থাপিত ছিল, তার ব্যাপারে পূর্ববর্তী নবীদের শিক্ষা ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষার মধ্যে সামান্য চুল পরিমাণ পার্থক্যও ছিল না) তখন তারা ফিকাহ্ ভিত্তিক আপত্তি উত্থাপন করতে লাগলো। এ প্রসঙ্গে তারা এই বলে আপত্তি জানালো-আপনি পানাহার সামগ্রীর মধ্যে এমন কিছুকে হালাল গণ্য করেছেন, যা পূর্ববর্তী নবীদের সময় থেকে হারাম হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এখানে এই আপত্তিটির জবাব দেয়া হয়েছে।

৭৭.

ইসরাঈল বলতে যদি এখানে বনী ইসরাঈল বুঝানো হয়ে থাকে, তাহলে এর অর্থ হবে, তাওরাত নাযিল হবার পূর্বে বনী ইসরাঈলরা কিছু জিনিস নিছক প্রথাগতভাবে নিজেদের জন্য হারাম করে নিয়েছিল। আর একথায় যদি হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়ে থাকে তাহলে এর অর্থ হবে, নিজের প্রকৃতিগত অপছন্দ অথবা কোন রোগের কারণে তিনি কোন কোন জিনিস পরিহার করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর সন্তানরা সেগুলো নিষিদ্ধ মনে করে নিয়েছিল। এ শেষোক্ত বক্তব্যটি বেশী প্রচলিত। পরবর্তী আয়াত থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, বাইবেলে উট ও খরগোশ হারাম হবার যে বিধান লিখিত হয়েছে তা মূল তাওরাতের বিধান নয়। বরং ইহুদী আলেমরাই পরবর্তীকালে এ বিধান কিতাবের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন সূরা আন’আম-এর ১২২ টীকা)।

*** চলমান ***

- সংগৃহিত