শীতের তীব্রতার কারণ নিয়ে হাদিসে যা বলা হয়েছে

শীতের তীব্রতার কারণ নিয়ে হাদিসে যা বলা হয়েছে

ছবি: সংগৃহীত

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জাহান্নাম দুইবার নিঃশ্বাস নেয়। একটি গ্রীষ্মে, একটি শীতে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম ও শীতের তীব্র ঠান্ডা সেই নিঃশ্বাস থেকেই আসে। কিন্তু পৃথিবীর বাস্তবতায় দেখা যায়, একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় যখন গ্রীষ্ম, তখন আমাদের দেশে শীত। আবার ইউরোপের অনেক অঞ্চলে গ্রীষ্মেও তীব্র গরম অনুভূত হয় না। তাহলে কি জাহান্নামের নিঃশ্বাস শুধু নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে কাজ করে?—হাদিসের আলোকে এক পাঠকের মনে এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশ্বাসই মূল ভিত্তি

এ বিষয়ে আলেমরা বলেছেন, একজন মুসলমানের জন্য মূলনীতি হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সব কথা নিঃশর্তভাবে সত্য বলে বিশ্বাস করা। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, তিনি নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলেন না; যা বলেন, তা ওহীর অংশ। সাহাবিরাও রাসুলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলতেন, তিনি সত্যবাদী ও সত্যে সমর্থিত।

হাদিসে কী বলা হয়েছে?

বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, জাহান্নাম আল্লাহর কাছে অভিযোগ করল, এক অংশ আরেক অংশকে গ্রাস করছে। তখন আল্লাহ তাকে বছরে দুটি নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দেন, একটি শীতে, একটি গ্রীষ্মে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপ জাহান্নামের উত্তাপ থেকে, আর শীতের তীব্র শৈত্যপ্রবাহ জাহান্নামের জমহরির থেকে আসে।

অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, মানুষ যে ধ্বংসাত্মক শীত ও ধ্বংসাত্মক গরম অনুভব করে, তার উৎস জাহান্নাম।

পৃথিবীর বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে মিলে?

আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, পৃথিবীর সব অঞ্চলে গরম ও ঠান্ডার মাত্রা একরকম নয়, এটি স্বাভাবিক। সূর্যের অবস্থান, সমুদ্রের বাতাস, বৃষ্টি, ভৌগোলিক অবস্থান, এসব কারণে কোথাও গরম কম অনুভূত হয়, কোথাও বেশি। ইউরোপ বা উত্তর আফ্রিকার কিছু এলাকায় গ্রীষ্ম মৃদু হওয়ার কারণ হতে পারে, ঠান্ডা সামুদ্রিক বায়ু বা নিয়মিত বৃষ্টি।

তবে এর পাশাপাশি একটি গায়েবি বা অদৃশ্য কারণও রয়েছে, যা শুধু ওহীর মাধ্যমে জানা যায়। আলেমদের মতে, তীব্র গরমের ক্ষেত্রে সূর্যের তাপ একটি দৃশ্যমান কারণ, আর জাহান্নামের নিঃশ্বাস একটি অন্তর্নিহিত, গায়েবি কারণ। একইভাবে, শীতের ক্ষেত্রেও সূর্যের দূরত্ব দৃশ্যমান কারণ হলেও, জাহান্নামের জমহরির নিঃশ্বাস তার পেছনের গায়েবি কারণ হতে পারে।

জাহান্নামে কি গরম ও ঠান্ডা একসঙ্গে?

কিছু আলেম বলেছেন, জাহান্নামের বিভিন্ন স্তর ও অংশে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা রয়েছে, কোথাও আগুনের প্রচণ্ড তাপ, কোথাও তীব্র ঠান্ডা। আবার কেউ বলেছেন, আখিরাতের বিষয়গুলো দুনিয়ার মানদণ্ডে পুরোপুরি মাপা যায় না। আল্লাহ চাইলে একই স্থানে বিপরীত দুটি অবস্থা একত্র করতেও সক্ষম।

হাদিসের বাহ্যিক অর্থই গ্রহণযোগ্য

ইমাম নববসহ অনেক মুহাদ্দিসের মতে, এই হাদিসকে রূপক বা উপমা হিসেবে না নিয়ে তার বাহ্যিক অর্থেই গ্রহণ করা সঠিক। কারণ, এতে বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু নেই। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় কার্যকারণ এমনভাবে স্থাপন করেছেন যে, প্রাকৃতিক কারণ ও শরিয়তি কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

হাদিসের শিক্ষা

শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.) ব্যাখ্যা করে বলেছেন, যেমন সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে, আবার একই সঙ্গে এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য সতর্কবার্তাও, তেমনি গরম ও ঠান্ডার ক্ষেত্রেও প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা থাকলেও হাদিসে বর্ণিত গায়েবি ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

সবশেষে আলেমরা বলেন, ঈমানদারের করণীয় হলো, দৃশ্যমান বাস্তবতা ও ওহীভিত্তিক সত্যকে একসঙ্গে গ্রহণ করা। একটিকে মানতে গিয়ে অন্যটিকে অস্বীকার করা যেমন ভুল, তেমনি প্রাকৃতিক কারণ পুরোপুরি অগ্রাহ্য করাও সঠিক নয়।

শেষ কথা

গ্রীষ্মের দাবদাহ হোক বা শীতের কনকনে ঠান্ডা, এসব শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, বরং আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন ও আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ। হাদিসের আলোকে এ বাস্তবতা মানুষকে আল্লাহভীতি ও আত্মশুদ্ধির দিকেই আহ্বান জানায়।

সূত্র : ইসলাম ওয়েব