জনমনে আস্থা ফেরাতে মব নিয়ন্ত্রণ জরুরি:আহসান হাবিব বরন
প্রতিকী ছবি
দীর্ঘদিনের কর্তৃত্বপরায়ণ ও স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর জনগণের মধ্যে স্বস্তি ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে এবার হয়তো একটু শান্তিতে বসবাস করা যাবে। কিন্তু বিধিবাম। স্বস্তির বদলে আমাদের সামনে এক জলজ্যান্ত বিভীষিকা হয়ে দেখা দিল-মব।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নৈতিক সংকটের সুযোগে ‘মব’ বা গণউন্মত্ততা যেন ধীরে ধীরে একটি স্বাভাবিক সামাজিক আচরণে পরিণত হয়েছে।
যখন-তখন যাকে তাকে মারধর, রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, গুজব সৃষ্টি করে মানুষ হত্যা-এসব দৃশ্য এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যুবক থেকে বৃদ্ধ, নারী থেকে সংখ্যালঘু—কেউই মব সন্ত্রাসের হাত থেকে নিরাপদ নয়। বিচার, তদন্ত কিংবা প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা যেন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সন্দেহই হয়ে উঠেছে মৃত্যুদণ্ডের একমাত্র কারণ।
এমন অরাজক পরিস্থিতিতে মাঠে সেনাবাহিনী না থাকলে হয়তো বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতো।
সিলেটের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় সাম্প্রতিক মব পরিস্থিতি কিংবা বিটিআরসি ভবন ও গণমাধ্যমে হামলার ঘটনাগুলোই তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এসব জায়গাতে সময়মতো সেনাবাহিনী পৌঁছাতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারত। এতে করে বড় ধরনের প্রাণহানি ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠত।
এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সেনাবাহিনী মাঠে থাকা সত্ত্বেও মবের তাণ্ডব থামানো যাচ্ছে না। বরং যেখানে মব সৃষ্টি হচ্ছে, সেখানেই সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। আমি মনে করি, এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান হতে পারে না।
সঙ্গত কারণেই এখানে প্রশ্ন তোলা যায় যে, সেনাবাহিনী উঠে গেলে কী হবে?
তখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কে সামাল দেবে?
সংবিধান অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুলিশের মনোবল এখনো পুরোপুরি ফেরেনি।
জনমনে পুলিশের প্রতি আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই আস্থাহীনতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। অনেক ক্ষেত্রে তারা জনগণের রক্ষক নয়, বরং শাসকের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের একটি অংশ নিষ্ক্রিয়, আতঙ্কগ্রস্ত কিংবা আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে গেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্য স্পষ্টভাবে বলা দরকার বলে আমি মনে করি। শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের সহযোগী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা কত? এক হাজার? দুই হাজার? পাঁচ হাজার? ধরা যাক সর্বোচ্চ দশ হাজার। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশের মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় আড়াই লক্ষ। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ পুলিশ সদস্য সরাসরি কোনো রাজনৈতিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
তাহলে পুরো বাহিনীকে সন্দেহের চোখে দেখার যৌক্তিকতা কোথায়? সত্যিকার অর্থে বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পুলিশকে ‘আসামি’ ভাবার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে রাষ্ট্রই দুর্বল হয়ে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে গোটা নাগরিক সমাজ। মাঠপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কোনো বিকল্প নেই। আমি মনে করি, সেনাবাহিনী সহায়ক শক্তি হতে পারে বিকল্প নয়।
পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আমাকে বলতেই হবে যে, পুলিশের মনোবল না ফেরার পেছনে শুধু জনরোষ নয় বরং পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতাও বড় কারণ বলে আমি মনে করি। এখনো পুলিশের ভেতরে পদ-পদবি, পোস্টিং ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এতটাই নোংরা যে তা রীতিমতো লজ্জাজনক।
বিশেষ করে পুলিশ হেডকোয়ার্টারকে ঘিরে যে গোষ্ঠীস্বার্থ, লবিং ও অনৈতিক প্রভাব কাজ করছে, তা মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করছে।
আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অতীতে যারা চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও তাদের অনেকেই ভালো পোস্টিং পেয়েছেন। কার্যত তারা পুরস্কৃত হয়েছেন। অন্যদিকে সৎ ও পেশাদার অনেক কর্মকর্তা উপেক্ষিত থেকেছেন। এই বৈষম্য পুলিশ বাহিনীর ভেতরে আস্থা ও শৃঙ্খলা ধ্বংস করছে। এই চরম সত্য কর্তৃপক্ষকে উপলব্ধি করতে হবে।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ঘটে যাওয়া ঘটনা পুলিশি সংকটের ভয়াবহ দিকটি আমাদের সামনে নতুন করে উন্মোচন করেছে।
“আমরা থানা পুড়িয়েছি, এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দিয়েছি”—এমন ভয়ংকর হুমকিযুক্ত বক্তব্য প্রকাশ্যে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, থানা চত্বরে সংগঠিত বিক্ষোভ, থানা ঘেরাও, রাতেই আদালত বসানোর দাবি তোলা হয়েছে। এসব কি আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
তাহলে পুলিশ কেন তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করতে পারেনি?
এ ঘটনায় পরে গ্রেপ্তার হওয়া মাহদী হাসান ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছেন—এটি আদালতের সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, থানায় ঢুকে ওসিকে হুমকি দেওয়ার সাহস কোথা থেকে আসে? কেউ যদি নিজেকে ‘আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার গঠনকারী শক্তি’ দাবি করে প্রশাসনকে নিজের অধীন ভাবতে শুরু করে, সেটি সরাসরি রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত বলে আমি মনে করি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১২৮। অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতি নয়, অবনতি ঘটেছে।
রংপুরের তারাগঞ্জে ভ্যানচোর সন্দেহে দুই নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেখিয়েছে—গুজবই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র। পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।
মব সন্ত্রাস শুধু ব্যক্তিকে হত্যা করছে না, এটি ধ্বংস করছে সহনশীলতা, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, সাংবাদিক নির্যাতন, গণমাধ্যমে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ। সব মিলিয়ে একটি ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। একইভাবে খোকন দাসের নির্মম মৃত্যু দেখিয়েছে যে, ধর্মীয় পরিচয় এখনো প্রাণনাশের কারণ হতে পারে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমি মনে করি, এসব সমস্যার সমাধান একক কোনো বাহিনী বা এক দিনের সিদ্ধান্তে আসবে না। দরকার আইনের শাসন ও নৈতিক মানের উন্নয়ন অর্থাৎ-
১. পুলিশকে পুনর্গঠন ও মনোবল পুনঃস্থাপন করতে হবে।
২. পুলিশের ভেতরে ন্যায়ভিত্তিক পদোন্নতি ও পোস্টিং নিশ্চিত করতে হবে।
৩. রাজনৈতিক চাপমুক্ত পেশাদার পুলিশিং প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৪. মব সন্ত্রাসে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে—যেই হোক, যে পরিচয়েরই হোক।
৫. সেনাবাহিনীকে ধীরে ধীরে সহায়ক ভূমিকা সীমিত করে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
শেষ কথা :
রাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে চায় এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। তাহলে ভয় নয়—আইনের শাসনই হতে হবে একমাত্র ভরসা। সেনাবাহিনী সংকটে রক্ষাকবচ হতে পারে। কিন্তু এটা স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। পুলিশকে শক্তিশালী, পেশাদার ও জনবান্ধব করার বিকল্প কিছু আমি দেখছি না। অন্যদিকে পুলিশকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নয় বরং সংস্কারের মাধ্যমে আস্থার জায়গায় ফেরাতে হবে। না হলে মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
ahabibhme@gmail.com