শিক্ষকদের ১৫ দিনের ছুটি: বিলাসিতা নয়, ন্যায্য অধিকার
জাকিরুল ইসলাম
বাংলাদেশে কিছু বিষয় আছে, যেগুলো না জেনেই মতামত দিতে মানুষ স্বচ্ছন্দ বোধ করে। শিক্ষকদের ১৫ দিনের ছুটি তার একটি। কেউ হিসাব করে না, কেউ কাঠামো বোঝে না—তবু সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। আশ্চর্যজনকভাবে, যারা এই ছুটির বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে কখনো যুক্ত ছিলেন না, তারাই সবচেয়ে বেশি নিশ্চিত যে এই ছুটি অপ্রয়োজনীয়।
বাস্তবতা অবশ্য এতটা সহজ নয়।
শিক্ষকদের টানা ১৫ দিনের ছুটি কোনো বিলাসিতা নয়। এটি সরাসরি যুক্ত শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা পাওয়ার শর্তের সঙ্গে। সরকারি চাকরির প্রায় সব বিভাগেই এই ভাতা রয়েছে। কিন্তু অন্য বিভাগগুলোতে বছরের যেকোনো সময় সুবিধামতো ছুটি নেওয়ার সুযোগ আছে। শিক্ষা বিভাগে নেই।
কারণ শিক্ষা বিভাগ এখনো ব্রিটিশ আমলের ঘোষিত ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট। শিক্ষকরা তিন বছর পর পর শুধু ভাতা পান, ১৫ দিনের ছুটি ভোগ করতে পারেন না। শিক্ষকদের ছুটি নেওয়ার সুযোগ রমজানের ছুটি, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন ছুটির ক্যালেন্ডার। রমজানের ছুটি ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে স্থির না হওয়ায় শিক্ষকরা গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন ছুটিতে শ্রান্তি বিনোদন ভাতা সমন্বয় করে নেন। অথচ এই সীমিত সময়ের মধ্যেই টানা ১৫ দিনের শর্ত পূরণ না হলে ভাতা দেওয়া হয় না।
কাগজে শীতকালীন ছুটি আছে। বাস্তবে সেই সময় খাতা দেখা হয়, ফলাফল প্রস্তুত হয়, ভর্তি কার্যক্রম চলে। ছুটি থাকে নথিতে, কাজ থাকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে ও ভেতরে—দুই জায়গাতেই। এই কাজগুলো বন্ধ করলে শিক্ষা ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে, আর চালালে ছুটির শর্ত ভাঙে। এই দ্বন্দ্বের আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত বহন করেন শিক্ষকই।
এই কাঠামোর ফলে একজন শিক্ষক তাঁর চাকরি জীবনে ন্যূনতম ১০ লক্ষ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। তবু এই ক্ষতিকে কখনো নীতিগত সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না। বরং প্রশ্ন ওঠে—“জানতেন না কেন চাকরি নিলেন?”
এই প্রশ্নটি সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যাকে অস্বীকার করার একটি সহজ কৌশল। জানতেন না বলেই তো আজ জানানো হচ্ছে। বৈষম্য বোঝার পর নীরব থাকা কোনো নাগরিক দায়িত্ব হতে পারে না।
সবচেয়ে বিদ্রূপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে একমাত্র শিক্ষক সমাজই এমন একটি পেশা, যারা কার্যত নিজেদের টাকা দিয়ে ছুটি কিনে নেয়। টানা ১৫ দিন পূরণ না হলে বৈধ ভাতা নেই। দেশের আর কোনো বিভাগে এমন নিয়ম নেই। কারণ অন্য জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব কাজের হিসাব মিলিয়ে দেখা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ছুটি কমানোর সিদ্ধান্ত বিশ্রাম কমানোর বিষয় নয়। এটি সরাসরি শিক্ষকদের আর্থিক অধিকার সংকুচিত করার শামিল। যারা শ্রেণিকক্ষের বাইরে বসে শিক্ষা পরিচালনা করেন, তাঁদের একবার ভাবা দরকার—শিক্ষককে ক্লান্ত রেখে শিক্ষা ব্যবস্থা কত দূর টানা যায়।
১৫ দিনের ছুটি কাগজে হয়তো বিলাসিতা মনে হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে এটি অধিকার।
আর অধিকারকে বিলাসিতা বলা শুরু হলে, সমস্যা ছুটিতে নয়—দৃষ্টিভঙ্গিতে।
লেখক :শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।