দুর্নীতির বরপুত্র কারাগারে
সংগ্রহীত ছবি
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো তাঁর কাছে নতুন অভিজ্ঞতা নয়। তবু সোমবার আর রেহাই মিলল না। দুর্নীতির মামলায় বরিশাল বিআরটিএর সাবেক সহকারী পরিচালক এমডি শাহ আলমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলেন জেলা ও দায়রা জজ আদালত। দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতের জামিনে বাইরে থাকা এই কর্মকর্তা নিম্ন আদালতে এসে ফের জামিন চেয়েও ব্যর্থ হন।
বিচারক শেখ ফারুক হোসেন জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালত চত্বর ছাড়ার সময় পরিস্থিতি আরো অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। পুলিশি পাহারায় অভিযুক্তকে নিয়ে যাওয়ার সময় ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের বাধা দেন তাঁর স্বজনরা।
অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের সামনেই বরিশাল থেকে প্রকাশিত দৈনিক মতবাদ-এর ফটো সাংবাদিক আব্দুর রহমানকে লাথি মারেন শাহ আলম নিজেই।
আদালতে পুলিশের কড়া প্রহরার মধ্যেও এমন আচরণ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, কার জোরে এত দুঃসাহস?
এক অফিসার, চার জেলা, ছক কিন্তু একই
শাহ আলমের কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অভিযোগের পরিধি কোনো একক অফিস বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও চট্টগ্রাম জেলার বিআরটিএ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের ধরনও প্রায় অভিন্ন। তিনি গণহারে অযোগ্য ও অননুমোদিত যানবাহনের রেজিস্ট্রেশনে দিয়েছেন।
দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, বরিশালে দায়িত্বে থাকাকালে তিনি ৩৪৪টি, ঝালকাঠিতে ৯৩৩টি এবং পিরোজপুরে ১০৮১টি বাস ও ট্রাকের ভূয়া রেজিস্ট্রেশন অনুমোদন দেন। মোট সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। এত বিপুলসংখ্যক রেজিস্ট্রেশন কি একজন কর্মকর্তার একক সিদ্ধান্তে সম্ভব? নাকি নেপথ্যে ছিল সুসংগঠিত একটি চক্র?
তদন্ত চলেছে, কিন্তু থামেনি দুর্নীতি
২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বরিশাল এবং ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শাহ আলম। এর আগেও ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে দায়িত্বে থাকাকালে প্রায় ৯ শ থেকে এক হাজার অবৈধ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০২২ সালে পুনরায় বরিশাল বিআরটিএতে যোগ দেওয়ার পর অনিয়মের চিত্র আরো স্পষ্ট হয়।
ওই বছরের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২৫৫টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে গুরুতর অসংগতি ধরা পড়ে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বিআরটিএ প্রধান কার্যালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
কিন্তু তদন্ত চলাকালীনই সামনে আসে নতুন তথ্য। ২০২২ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আরো ৮৯টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়। এসব গাড়ির মালিক চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা হলেও রেজিস্ট্রেশন করা হয় বরিশাল বিআরটিএ থেকে। আইন ও দপ্তরীয় আদেশ অনুযায়ী যা স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই দুর্নীতির সঙ্গে দপ্তরের অধিকাংশ কর্মী জড়িত। কিন্তু তারা আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন।
কোটি টাকার হিসাব, নীরব প্রশাসন
দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গত আট বছরে শাহ আলমের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অবৈধ রেজিস্ট্রেশনই ছিল এই অর্থ আয়ের প্রধান পথ।
কিন্তু এখানেই শেষ নয় প্রশ্ন। একের পর এক অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন, এমনকি মামলা দায়েরের পরও কীভাবে একজন কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই কায়দায় কাজ চালিয়ে যেতে পারলেন? অভ্যন্তরীণ নজরদারি কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল? নাকি এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন আরো অনেকে?
একজন জেলে, অন্যদের কী হবে?
এখন শাহ আলম কারাগারে। কিন্তু তাঁর সময়ে দেওয়া হাজার হাজার রেজিস্ট্রেশন এখনো বহাল। সেগুলোর বৈধতা কী হবে, এর সঙ্গে জড়িত দালালচক্র ও দপ্তরের ভেতরের সহায়তাকারীরা আদৌ চিহ্নিত হবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই।
আদালতের নির্দেশে একজন কর্মকর্তা জেলে গিয়েছেন। কিন্তু বিআরটিএর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই রেজিস্ট্রেশন বাণিজ্য, তার শেকড় কতটা গভীরে, আর সেটি উপড়ে ফেলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা আদৌ আছে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনুসন্ধানের বিষয়।