সোশ্যাল মিডিয়ায় আলেমদের বিরোধ: প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আস্থার জায়গা

সোশ্যাল মিডিয়ায় আলেমদের বিরোধ: প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আস্থার জায়গা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ইসলামি অঙ্গনে ইদানীং এক অস্বস্তিকর পরিবেশ লক্ষ করা যাচ্ছে। ধর্মীয় বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে কিছুসংখ্যক আলেম ও বক্তার মধ্যে পারস্পরিক অসংযত বিষোদ্গার ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।

বর্তমান চিত্র ও অস্থিরতার নেপথ্যে

সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ করা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি (লাইভ) বক্তব্য কিংবা লিখনীর মাধ্যমে একে অপরের ভুল ধরতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর ও অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। এক আলেমের বক্তব্যের জবাবে অন্য আলেমের ‘পাল্টাপাল্টি আক্রমণাত্মক’ সংস্কৃতি এখন ভার্চুয়াল জগতে বেশ দৃশ্যমান। প্রযুক্তির অপব্যবহারে অনেক সময় ভিডিওর খণ্ডিত অংশ বা ‘ক্লিপ’ ভাইরাল করে পারস্পরিক দূরত্ব ও তিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই বিতর্ক জ্ঞানতাত্ত্বিক বা ফিকহি মতপার্থক্য ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত রেষারেষিতে রূপ নিচ্ছে।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান

অবশ্য এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এ দেশের বিপুলসংখ্যক আলেম এখনো অত্যন্ত দায়িত্বশীল, সংযত ও ঐক্যকামী ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাঁরা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিকতা প্রদর্শনে নিরলস কাজ করছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু দৃশ্যমান নেতিবাচক আচরণ সামগ্রিক পরিবেশকে সাধারণ মানুষের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব অন্য আলেমদের ওপরও পড়ছে।

বিভ্রান্তিতে সাধারণ মানুষ ও নেতিবাচক প্রভাব

আলেমদের এই পারস্পরিক অসংযত আচরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মুসলমানদের ওপর। আলেম সমাজকে মানুষ পথপ্রদর্শক হিসেবে শ্রদ্ধা করে। যখন তারা দেখেন আলেমদের একাংশ একে অপরকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করছেন, বিদ্রুপ করছেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে দ্বীন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ আলেমদের প্রতি আগ্রহ বা শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলছে, যা তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ইসলামের দিকনির্দেশনা ও আলেমদের দায়িত্ব

ইসলামে মতপার্থক্য বা ‘ইখতিলাফ’ কোনো নতুন বিষয় নয়। সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্ববর্তী প্রাজ্ঞ ইমামদের মধ্যেও অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ছিল অটুট ভ্রাতৃত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ। এ বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে-

১. ঐক্যের গুরুত্ব: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান: ১০৩)

২. ব্যক্তিগত আক্রমণের নিষেধাজ্ঞা: ইসলামে গিবত, অপবাদ ও একে অপরকে বিদ্রূপ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীর চেয়ে উত্তম...।’ (সুরা হুজুরাত: ১১)

৩. উম্মাহর ভ্রাতৃত্ব: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না এবং তাকে লজ্জিত করবে না।’ (সহিহ মুসলিম)

উত্তরণের পথ কী?

ইসলামি চিন্তাবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, বর্তমান অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে আলেমদের মধ্যে দ্রুত ইলমি শিষ্টাচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

ব্যক্তিগত সংলাপ: কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকলে তা জনসমক্ষে না এনে ব্যক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা।

উদারতা ও সহনশীলতা: গৌণ বা ফিকহি মতপার্থক্য নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে ইসলামের মূল বুনিয়াদি শিক্ষা ও উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে উদারতা প্রদর্শন করা।

সোশ্যাল মিডিয়ার দায়িত্বশীল ব্যবহার: বক্তা ও তাঁদের অনুসারীদের উচিত সোশ্যাল মিডিয়ায় অসংযত ক্লিপ প্রচার বন্ধ করে গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।

আলেমরা হলেন নবীদের উত্তরসূরি বা ‘ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া’। তাঁদের জ্ঞান ও আচরণের ওপর সাধারণ মানুষের আদর্শিক মজবুতি নির্ভর করে। যখন আলেমদের একাংশ পারস্পরিক বিভেদ ও বিতর্কে লিপ্ত হন, তখন উম্মাহর সামগ্রিক স্বার্থ ও দ্বীনি ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমান সময়ের নানামুখী সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অসংযত পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিহার করে আলেম সমাজের মধ্যে আদর্শিক সংহতি ও ঐক্য ফিরিয়ে আনা সময়ের দাবি।