মাধ্যমিকে পদোন্নতির নামে বিশৃঙ্খলায় লাগাম: শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগে ফিরছে আস্থা
জাকিরুল ইসলাম
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—এই বাক্যটি আমরা এতবার উচ্চারণ করেছি যে, আজ আর ব্যথা অনুভূত হয় না। অথচ বাস্তবতা বলছে, সেই মেরুদণ্ডেই সবচেয়ে বেশি চাপ। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে পাঠদানের অভিজ্ঞতা নয়, বরং ফাইল চালানোর দক্ষতা ও নীরব সমন্বয়ই ক্ষমতার মূল যোগ্যতা হয়ে উঠেছে।
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে ৮২ জন দাপ্তরিক কর্মচারী হঠাৎ ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা হয়ে মাঠপর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বে হাজির হন। এতদিন যারা মুদ্রাক্ষরিক, কম্পিউটার অপারেটর বা হিসাব রক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন, তারা আজ শিক্ষক তদারকিতে। বলা হয়েছে, সবই হয়েছে ২০২১ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী। শিক্ষকরা ভাবছেন—এত দ্রুত কার্যকর বিধিমালার প্রয়োগ সাধারণত কবে দেখেছেন!
পদোন্নতির পেছনের কৌশল আরও চমকপ্রদ। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা অত্যন্ত সংগঠিত। তারা জানেন কখন কথা বলতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে, আর কখন কোথায় “বোঝাপড়া” দরকার। নীতিমালার পাতায় এমন কিছু সংশোধন ও ব্যাখ্যা জন্মায়, যা বাইরে বৈধ দেখালেও ভেতরে ভেতরে বিস্ময়করভাবে কার্যকর। শিক্ষকরা যেটাকে বছরের পর বছর ‘অসম্ভব’ বলে শুনে আসেন, সেটিই অন্যদের ক্ষেত্রে ‘প্রশাসনিক দক্ষতার’ নমুনা।
অন্যদিকে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের বাস্তবতা করুণ। নীতিমালা অনুযায়ী সাত বছর পর সিনিয়র শিক্ষক হওয়ার কথা থাকলেও বহু শিক্ষক ১৫, ২০ বছর চাকরি করে পদোন্নতি পাচ্ছেন না এমনকি ৩০ বছর একই গ্রেডে চাকরি করে অবসরে যাচ্ছেন। তাদের কোনো সংগঠিত তৎপরতা নেই, কোনো নীরব দরজা খোলার কৌশলও নেই। অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার প্রতিদান এখনও তাদের হাতে আসেনি।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—একই ২০২১ সালের বিধিমালায় বলা আছে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের ৫০ শতাংশ পদ সরকারি মাধ্যমিকের সিনিয়র শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত। বাস্তবে এই বিধান আজও কাগজে সুন্দর, কিন্তু মাঠে অকার্যকর। শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীর চোখের ভাষা পড়া শিক্ষকরা মাঠ প্রশাসনের বাইরে, আর শ্রেণিকক্ষ না দেখার অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠছে তদারকির যোগ্যতা।
ফলে খুব শিগগিরই এমন এক বাস্তবতা স্বাভাবিক হয়ে যাবে—যাঁরা কখনো পাঠদানের চাপ, পরীক্ষার খাতা বা অভিভাবকের প্রশ্ন সামলাননি, তারাই শিক্ষকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করবেন। মুখে একটাই সম্বোধন—‘স্যার’। প্রশ্ন হলো, শিক্ষকতার সম্মান বাড়বে, না বিব্রতবোধই গভীর হবে?
এই সংকটে নতুন শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের জন্য আশার দিক। তিনি একজন সৎ ও আপসহীন নেতা হিসেবে পরিচিত। অতীতে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময় শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা শিক্ষকরা মনে রাখেন। বিতর্কিত পদোন্নতি বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি তার জানা ছিল না এবং প্রয়োজন হলে রিভিউ হবে। পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন স্থগিতের নির্দেশ প্রমাণ করে—চাইলে অন্যায্য ও অস্বাভাবিক পথ থামানো যায়।
অতীতের যে নীরব সমন্বয় ও প্রশাসনিক সুবিধার মাধ্যমে এই পদোন্নতির শর্টকাট তৈরি হয়েছিল, তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের ওপর এসে পড়ে। শিক্ষকরা বিশ্বাস করেন, শিক্ষামন্ত্রীর দ্রুত পদক্ষেপে এই অন্যায্য ব্যবস্থা বন্ধ হবে। এতে শিক্ষকরা মর্যাদা পাবেন, অভিভাবকরা আস্থা ফিরে পাবেন, আর শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত ও শিক্ষামুখী হবে।
শিক্ষকরা দাবি করেন—সরকারি মাধ্যমিকের অভিজ্ঞ শিক্ষকরা সহকারী শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পদে পদায়ন হোক। দীর্ঘদিন ফাঁকা থাকা পদগুলো পূরণ করলে প্রশাসনিক গতি ফিরে আসবে, শিক্ষার মান উন্নত হবে, এবং মেধাবীরা শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাবে না।
নইলে একদিন সত্যিই দেখা যাবে—ফাইলই পাঠ্যপুস্তক, সমন্বয়ই যোগ্যতা, কেরানিরা বস, আর শিক্ষকরা কেবল তদারকির বস্তু।
লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল