পাবনায় দুই দিনের পেট্রোল ফুরাচ্ছে কয়েক ঘণ্টায়

পাবনায় দুই দিনের পেট্রোল ফুরাচ্ছে কয়েক ঘণ্টায়

সংগৃহীত ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে। সংকট আতঙ্কে পাবনায় দুই দিনের পেট্রোল ৫ থেকে ৭ ঘণ্টায় ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি পাম্প মালিকদের। তবে ক্রেতারা বলছেন, মজুদ কারসাজি করছেন ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে কারসাজি রোধে প্রশাসনকে আরও তৎপর হবার তাগিদ তাদের।

তথ্য বলছে, সম্প্রতি ইসরায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলার পর যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে মধ্যপ্রাচ্যে। এর ফলে দেশে পেট্রোল সহ জ্বালানি তেলের সংকট আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে দেশবাসীকে। এ আতঙ্কে গত ৫ মার্চ বিকেল থেকে হঠাৎ করেই বেশি করে তেল ভরে রাখতে পাবনার পাম্পগুলোতে ভীড় জমাতে শুরু করেন বাইকাররা। সন্ধ্যা থেকে রাত গড়াতেই বাইকারদের তান্ডবে তেল ফুরিয়ে যায় পাম্পগুলোতে।

পরদিন পাবনার অধিকাংশ পাম্পে তেল না থাকায় বন্ধ থাকে। তবে এরপরদিন পাম্পগুলোতে তেল আসলেও অতি চাপে কয়েক ঘন্টায় তেল ফুরিয়ে যায়। এতে জরুরী প্রয়োজন হলেও অনেকেই তেল না নিয়েই ফিরে যায়। একই সমস্যা অব্যাহত রয়েছে এখনো।

পাম্প মালিক ও কর্মচারীরা জানায়, অনেকটা স্বাভাবিক সময়ের ন্যায় পেট্রোল আসলেও বাইকারদের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে স্বাভাবিকভাবে বিক্রয় করা যাচ্ছে না। পেট্রোল আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাইকাররা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। এতে দিনের অধিকাংশ সময়ই পেট্রোল বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

এব্যাপারে পাবনা শহরের রাধানগর এলাকার এসএম ফরিদ ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আলামিন বলেন, ‘আগে পেট্রোল আনতে আমাদের গাড়ি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। এখন কিছু সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তবে তেল প্রায় একই পরিমাণে পাচ্ছি। কিন্তু বেঘাত ঘটাচ্ছে গ্রাহকেরা। যিনি পূর্বে ২০০ টাকার তেল নিতেন সে এখন এসে ২ হাজার টাকার চাচ্ছেন। কিন্তু আমরা ২০০ টাকার বেশি দিচ্ছি না। ফলে অনেকেই তেল নিয়ে আবার এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। এতে তেল দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আগে হয়তো সাড়ে ৪ হাজার লিটার পেট্রোল এনে খুবই স্বাভাবিকভাবে দুদিন ধরে বিক্রি করতাম। কিছুটা থাকতেই আবার গাড়ি পাঠানো হতো। কিন্তু এখন ওই পেট্রোলই ৫ থেকে ৭ ঘন্টায় ফুরিয়ে যাচ্ছে।’

অনন্ত বাজার এলাকার হাইওয়ে ফিলিং স্টেশনের এক কর্মচারী বলেন, ‘কোনো পাম্প তেল মজুদ তো দুরে থাক কিছুটা রিজার্ভেই বা রাখবে কিভাবে। যা আসতেছে তা আনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ বাড়িতে বোতলে ভরে রেখে বাইকের ট্যাংক খালি করে আবার আসতেছেন। কিছু বাইকার প্রতিদিনই তেল নিচ্ছেন। এতে অন্যরা তেল পাচ্ছেন না। সেগুলো ফেইসবুকে ভাইরাল করে দেয়া হচ্ছে। মূলত এভাবেই সংকটের ভয় ছড়িয়ে পড়েছে।’

পাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দিনের অধিকাংশ সময়ই পাম্পগুলোর সামনে রশি টানিয়ে বন্ধ রাখা হচ্ছে। বন্ধ থাকলেও পাম্পের সামনে অনেক বাইকার তেলের অপেক্ষায় রয়েছেন।

পেট্রোলের অপেক্ষায় থাকা হাসানুর রহমান বলেন, ‘বড় বিপদে আছি। সরকার বলে তেলের সংকট নাই। এদিকে পাম্পে তেল পাচ্ছি না। এভাবে মেপে মেপে তো কাজ করা যায় না।’

অন্য বাইকারদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সবাই একটা জ্ঞানী ভাব ধরে থাকেন। এ ওকে জ্ঞান দেন আবার ও দেয় একে। কিন্তু বস্তুত কি তাদের জ্ঞান বা শিক্ষা দীক্ষা আছে? আমি মনে করি ভয়ের নামে যারা প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত তেল নিচ্ছেন, তারাই এই সংকট সৃষ্টি করেছেন। সাথে পাম্প মালিকরা তো আছেনই। তারাও কারসাজি করছেন নিশ্চিত। এদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি রাখা উচিত।’

মামুন হোসেন নামের এক বাইকার বলেন, ‘আমি সংবাদপত্রে কাজ করি। কাজের তাগিদে আমাদের প্রতিনিয়িত ছুটতে হয়। কিন্তু পেট্রোল নিয়ে ভোগান্তির শেষ নেই। তেলের অভাবে দুদিন বাইকই বের করতে পারিনি। প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত না নিলে এই সমস্যা এতোটা প্রকট হতো না।’

তেল নিয়ে পাম্প থেকে বের হচ্ছিলেন আকাশ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুরুতে বেশি তেল নিতে এতো হুড়োহুড়ি করিনি। কিন্তু এখন দেখছি সমস্যা আরো বাড়ছে। তাই বেশি করে ভরতে চাইলাম। কিন্তু ৩০০ টাকার বেশি দিলো না। তবে পাম্প ওয়ালারা বোধ হয় খোলাবাজারিদের কাছে অতি গোপনে বিক্রি করছেন। তা নাহলে গ্রামে তেল মিলছে কি করে, সেখানে ১৫০-১৮০ টাকা করে দাম নেয়া হচ্ছে।’

এদিকে তেল মজুদ ও অতিরিক্ত দাম নেয়া সহ কারসাজি রোধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহে পাম্পগুলো তেল কিছুটা কম পাওয়ায় একটু সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক শাহেদ মোস্তফা বলেন, ‘তেল মজুদ রাখা বা কারসাজি করার সুযোগ নেই। পাম্পগুলোর রিজার্ভার চেক দেওয়া হচ্ছে। খেলাবাজারে বিক্রিও বন্ধ রাখা হয়েছে। এবিষয়ে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।’