মার্কিন-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ইরানই জিতবে
সংগৃহীত ছবি
১৯০৮ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের মসজিদ সোলেইমান এলাকায় তেল আবিষ্কারের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশ ব্যবসায়ী উইলিয়াম নক্স ডি’আর্সি-এর উদ্যোগে অনুসন্ধানের পরে ব্রিটিশের স্বার্থে পরিণত হয় ইরানের তেল। ব্রিটিশ সরকার অ্যাংলো-পারসিয়ান অয়েল কম্পানির বড় অংশের মালিকানা নেয় এবং আবাদান তেল শোধনাগার ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই তেল সম্পদ থেকে ইরান খুব কম লাভ পেত।
১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক তেল শিল্প জাতীয়করণের ঘোষণা দেন এবং জাতীয় ইরানি তেল কম্পানি গঠন করেন। এতে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি হয়। যে কারণে ১৯৫৩ সালে ইরানে একটি অভ্যুত্থান ঘটে, যার ফলে মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ এবং ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ এতে ভূমিকা রাখে।
ফলে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি আবার ক্ষমতায় শক্তিশালী হন এবং পশ্চিমা তেল কম্পানিগুলো ইরানের তেল শিল্পে প্রভাব বিস্তার করে।
১৯৫৪ সালে একটি আন্তর্জাতিক তেল কনসোর্টিয়াম গঠিত হয়, যেখানে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, এক্সনমোবিল, শেভরন এবং রয়্যাল ডাচ শেল যুক্ত ছিল। পরবর্তী সময় ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের মাধ্যমে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে বিদেশি তেল কম্পানিগুলোকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং তেল শিল্প সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর থেকে ইরানের তেল উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছে জাতীয় ইরানি তেল কম্পানি।
ইরানের বিরুদ্ধে দশকের পর দশক ধরে মার্কিন-ইসরায়েলের নির্দেশে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমে যে পারমাণবিক অস্ত্রের অভিযোগগুলো করেছে, তা মূলত প্রোপাগাণ্ডা। এর মূল লক্ষ্য ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মতি উৎপাদন করা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা এবং আঞ্চলিক আধিপত্যে নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করা। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইল যৌথ বাহিনী ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিচালনা করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অনেক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে। ইরান এই হামলার পরে তৎক্ষণাৎ পালটা জবাব হিসেবে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধে ব্যাপক মানবিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
মানবিকভাবে ইরান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাতের ফলে প্র্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত, যার মধ্যে পাঁচ শতাধিত শিশু ও নারী রয়েছে। ইরানে পক্ষে যুদ্ধ করার কারণে লেবাননের প্রায় ৪০০ জন নিহত হয়েছে, ইসরায়েলের কমপক্ষে শতজন জন নিহত হয়েছে। মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছে। তেলের ডিপো, জ্বালানি কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র, বিমান প্রতিরক্ষা রাডার ও সামরিক কারখানাসহ হাজার হাজার স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরাইলের বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর, শিল্প রিসার্চ ল্যাবরেটরি এবং স্থলবন্দর তছনছ হয়ে গেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ড্রোন আক্রমণে মার্কিন ও সৌদি যুদ্ধজাহাজ এবং কিছু রাডার ও সামরিক ঘাঁটি আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লোকজনকে চলে যেতে বাধ্য করেছে ইরান। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আর দ্বিতীয় ঘটেনি। ইরানের প্রতিরক্ষা নীতি, সামরিক দক্ষতা এবং কূটনৈতিক সমন্বয় পুরো বিশ্বের নজর কাড়ছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত, তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিশ্ব বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে, স্কুল-কলেজ বন্ধ রয়েছে এবং শহরগুলোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবেশ ও অর্থনীতিতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া মূল কারণ, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের অংশীদারিত্বের প্রশ্নে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব বৃদ্ধি, চীনের বাণিজ্য ও সামরিক শক্তিকে সীমিত করা এবং সামরিক অস্ত্র ও বাণিজ্যে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠাই অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মাথাব্যথা চীন। চীনের ব্যবসা-বাণিজ্য যেভাবে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থে সরাসরি আঘাত করছে। এই প্রবৃদ্ধি মার্কিন অর্থনীতি এবং বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের প্রাধান্য হুমকির মধ্যে ফেলছে, যা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চীনের বিশ্বব্যাপী প্রভাবকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
এই কারণে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ‘গ্রেট আমেরিকা’ ধারণা বজায় রাখতে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে ইরানকে লক্ষ্য করা হয়েছে, যাতে ইরানের ওপর আঘাত সৃষ্টি করে চীনের তেলের সরবরাহে বাধা দেওয়া যায়। তেলের এই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীনের শিল্পকারখানা বন্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী, যা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রধান রুট, তা দখল করাও এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। যে ধারাবাহিকতায় খোমেনিসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করছে। এমনকি ভবিষ্যতে খোমেনির ছেলেকেও লক্ষ্য করা হবে এবং নতুন সরকার অবশ্যই ট্রাম্পের পছন্দ অনুযায়ী হতে হবে এ কথা বলছেন তিনি।
চীন হরমুজ প্রণালী থেকে মোট তেলের প্রায় ৩৮% সংগ্রহ করে এবং তার শিল্প উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই তেলের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালী চীনের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রিসোর্স। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নিজের প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করে, তবে চীন এই তেল সরবরাহ করতে পারবে না। এতে চীনের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই কারণে চীনও কোনোভাবেই ইরানে মার্কিন-সমর্থিত বা ‘তাবেদার’ সরকার দেখতে চায় না। চীনের মূল লক্ষ্য হলো ইরানে স্থিতিশীল এবং নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম সরকার থাকা, যাতে হরমুজ প্রণালী থেকে তেল প্রবাহ অব্যাহত থাকে। চীনের স্বার্থ অনুযায়ী, ইরানকে মার্কিন প্রভাব থেকে দূরে রাখা অপরিহার্য।
অন্যদিকে, রাশিয়াও দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে সামরিক চুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৌশলগত সহযোগিতা করছে। ইরান রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সহায়ক, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার এবং পশ্চিমা শক্তির মোকাবিলায়। রাশিয়ার স্বার্থও চীনের মতোই স্পষ্ট। রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ইরানকে শক্তিশালী রাখছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারকে কঠিন করছে। ইরান একটি কৌশলগত বাফার হিসেবে কাজ করছে, যেখানে রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য সিস্টেমগুলো মার্কিন ও ইসরাইলি নীতি প্রতিহত করতে সক্ষম।
চীন ও রাশিয়ার স্বার্থ একযোগে ইরানের ওপর নির্ভরশীল। তারা চাইছে যে ইরান স্বাধীনভাবে এবং মার্কিন প্রভাবের বাইরে থাকে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের প্রবাহ, সামরিক ভারসাম্য এবং কৌশলগত প্রভাব তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হস্তক্ষেপ, নতুন সরকার পরিবর্তন বা আধিপত্য বিস্তার, চীন ও রাশিয়ার স্বার্থকে সরাসরি আঘাত করবে। তাই ইরান একা নয়, চীন ও রাশিয়ার তার পাশে। চীনের শিল্প ও তেল নির্ভরতা, রাশিয়ার সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থ মিলিয়ে ইরানকে মার্কিন-ইসরাইলি প্রভাববলয় থেকে মুক্ত রাখা তাদের নীতি ও কৌশলের মূল লক্ষ্য।
ভারত হরমুজ প্রণালী থেকে প্রায় ১৫% তেল সংগ্রহ করে এবং তার শিল্প ও শক্তি নিরাপত্তার জন্য এই সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতও চীনের মতোই চায় না ইরানে মার্কিন আধিপত্য তৈরি হোক। ভারত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন, তেলের চুক্তি এবং অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীল ও স্বাধীন কাঠামো বজায় রাখতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও নৌঘাঁটিগুলি কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বহুস্তরীয় স্বার্থের কারণে রেখেছে। শুধু স্থলবদ্ধ ঘাঁটি নয়, সমস্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে নজরদারি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নৌঘাঁটিও স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ফার্সি উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ রুট অন্তর্ভুক্ত। এসব স্থাপনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পথ নিয়ন্ত্রণ, আঞ্চলিক রাজনীতি স্থিতিশীল রাখা, অস্ত্র বিক্রি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য স্থাপন করেছে। কাতারের আল-উদেইদ বেস, কুয়েত এয়ারবেস, বাহরাইনের নৌবাহিনী ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাল-ডাফরা বেস এবং সৌদি আরবের সীমিত ঘাঁটিগুলো রাডার ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে আকাশপথে হুমকি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়।
ইরান এসব স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালিয়েছে। বিভিন্ন ঘাঁটি ও রাডার সিস্টেম ধ্বংস করা হয়েছে এবং সৌদি আরবে অবস্থিত সিআইএর কেন্দ্রীয় অফিসও ভেঙে দিয়েছে। এই হামলা মার্কিন আধিপ্রভাবের জন্য বিপুল হুমকি সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আশা করেছিল, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পালটা হামলা চালাবে, কিন্তু তা বাস্তবে হয়নি। ইতিমধ্যেই ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ইরান সমর্থিত বাহিনী সেখানে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিপরীতে ইরান অদম্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। খালি চোখে মনে হতে পারে ইরান একা লড়ছে, তবে নেপথ্যে দেশটিকে শক্তিশালী করছে রাশিয়া ও চীনের প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তা। সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে, এই দুই পরাশক্তি তেহরানকে আধুনিক মিসাইল গাইডেন্স, জ্যামিং সিস্টেম এবং সাইবার যুদ্ধে সহায়তা করছে, যা মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
পর্দার আড়াল থেকে চীন ও রাশিয়া ইরানকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সাহস ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। চীনের বিস্তৃত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এখন পশ্চিম এশিয়ার আকাশে এক পাহারাদারের মতো কাজ করছে, মার্কিন ও ইসরাইলি পদক্ষেপ তৎক্ষণাৎ ইরানের নজরে আসে এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এছাড়া মার্কিন জ্যামিং প্রযুক্তি কার্যকর হচ্ছে না, কারণ চীনের স্যাটেলাইট-ভিত্তিক সহায়তা ইরানের জন্য কার্যকর প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল জানিয়েছে যে রাশিয়া এই সংঘাতে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। রাশিয়া ইরানকে উন্নত সাইবার যুদ্ধের সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি এবং মার্কিন ও ইসরাইলি মিসাইল সিস্টেমের কার্যকারিতা ও দুর্বলতার তথ্য সরবরাহ করছে। ইরান এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মার্কিন ড্রোন এবং নির্ভুল মিসাইলকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরান রাশিয়ার তৈরি কাসুকা ৪ (Kasuka-4) এবং মার্মানস্ বিএন সিস্টেম (Marmans BN system) ব্যবহার করছে, যা ৩-৫ কিমি পর্যন্ত শত্রুর স্যাটেলাইট জ্যাম করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন মিসাইলের গাইডেন্স কমে যাওয়ায় এই জ্যামিং প্রযুক্তি প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
ইরানও তার জন্মকাল থেকে লড়াই চালিয়ে আসছে এবং মার্কিন-ইসরাইলের আধিপত্যের সামনে পূর্বে কখনো মাথানত বা আত্মসমর্পণ করেনি এবং এই যুদ্ধেও করবে না। ইরান বারবার ঘোষণা করেছে যে তারা কোনো চাপ বা সামরিক হুমকির মুখে আত্মসমর্পণ করবে না। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব বহুবার বলেছেন, ইরানের নীতি হলো স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরোধের রাজনীতি বজায় রাখা।
মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারাও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান সম্পর্কে সতর্কতা জানাচ্ছেন। তাদের মতে, ইরানকে সরাসরি হারানো সহজ হবে না, দেশে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতিতে চাপ, মার্কিন অর্থনীতি, সেনাদের জীবন ও সামরিক সম্পদও বিপন্ন করবে।
যুদ্ধের জয়-পরাজয় অস্ত্র দিয়ে নিরীহ মানুষ হত্য বা স্থাপনা গুড়িয়ে দেওয়ার উপর নির্ভর করে না। বরং জয় নির্ধারিত হয় উদ্দেশ্য পূরণে মাধ্যমে। একটি জাতির আত্মপরিচয় বোমা মেরে ধ্বংস করা যায় না। সাময়িকভাবে একটি দেশ বা দেশের রাজধানী দখল করা অথবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও তাদের ভাষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস, ঐতিহ্য, দেশপ্রেম, মূল্যবোধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌম চেতনা দখল করা যাবে না। অতীতে ইরান কখনো মাথানত করেনি, এবারও করবে না। মার্কিন-ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া এ যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ইরানই জিতবে।
লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক
sk.rafiq1982@gmail.com