রাষ্ট্রের কর্ণধারকে লেখা খোলা চিঠি
সংগৃহীত ছবি
স্মরণকালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রশাসন যে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে, জাতি তাকে চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। সমালোচকদের মুখে ছাই পড়েছে। তাকে যদি কোনো উচ্চ সম্মানজনক পদে রেখে দেওয়া যেত, তাহলে প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হতো। শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতি ও দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার কাছেই নন, বরং গোটা বিশ্বের কাছেই তিনি শ্রদ্ধার পাত্র।
বাংলাদেশ যখনই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে, সেনাবাহিনী গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫-এর ৭ই নভেম্বর, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০২৫-এর জুলাই বিপ্লব এবং ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা জনগণের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নীরব থেকে সমালোচনা সহ্য করে জাতির লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে থেকেছেন। নির্বাচনে সেনাবাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
জাতি এই দুই সম্মানিত ব্যক্তির কাছে চিরঋণী থাকবে।
প্রচারণায় একটি দল ‘জান্নাতের সার্টিফিকেট’ দিয়ে ভোটার টানার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের দুর্নীতি, সিলব্যালট ও অর্থ বিতরণের খবর প্রকাশ পেলেও আপনি নীরব থেকেছেন। আমার ধারণা, ভিন্ন দলের নেতাদের সংসদে আনতে আপনি ছাড় দিয়েছেন।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সংবাদ সম্মেলন, বিরোধী নেতাদের বাসায় যাওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ—এসব আপনার উদারতার পরিচয়। দেশের মানুষ আপনার দক্ষ নেতৃত্বে শান্তিতে থাকবে।
যতই দিন যাচ্ছে আপনার ব্যবহার ও আচরণ দেশবাসীর প্রশংসা কুড়াচ্ছে। বিরোধী দলের সমালোচনা সত্ত্বেও আপনি তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে কাছে টেনেছেন, দেশের কল্যাণে একযোগে কাজের আহ্বান জানিয়েছেন—টক শো ও সামাজিক মাধ্যমে যা সবার চোখে পড়েছে। এটাই আপনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।
আইন-শৃঙ্খলা উন্নত করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিতে জিরো টলারেন্স, অপরাধের মাত্রাভেদে শাস্তির চেয়ে সংশোধনে গুরুত্ব দেওয়া, সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, তোষামোদকারীদের এড়িয়ে চলা, কর্মপরিকল্পনা নিয়ে গবেষণা করা, মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, মেধাবীদের মূল্যায়ন ও কৃষকদের ঋণদান—এসব এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষায় নামিদামি প্রতিষ্ঠানে বেতন কমিয়ে দরিদ্র মেধাবীদের পড়ার সুযোগ দিতে হবে। দারিদ্র্য দূর করে স্বাবলম্বী করতে হবে। মানুষের চাওয়াগুলো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। মন্ত্রী-এমপিদের সেবক হয়ে কাজ করাই হবে লক্ষ্য। দেশ পরিচালনায় আপনাকে হজরত ওমরের (রা.) মতো হতে হবে। দুশমন ও মুনাফিকদের থেকে সাবধান থাকবেন। আপনি পারবেন, ইনশাআল্লাহ।
অন্তর্বর্তী সরকারের অসমাপ্ত কাজগুলো গুরুত্ব দিতে হবে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর, শহীদ পরিবারের খোঁজখবর, আহত-পঙ্গু-অসুস্থদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব আপনার পরিকল্পনায় রাখবেন। অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে শহীদ হাদির পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন; আপনি শুধু বিচার প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করবেন।
সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলুদ সাংবাদিকতা নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সংবাদ পরিবেশন করে সরকারকে সঠিক পথ দেখানো। মিডিয়াকে বলব, সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করুন। দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে সরকারকে সহযোগিতা করুন। সরকার সাংবাদিকদের মতামতকে গুরুত্ব দেবে।
জামায়াতে ইসলামী সরকারে না থেকে বিরোধী দল ও রাজপথে থাকার অভিমত দিয়েছে। কিন্তু জনগণ আর রাজপথ চায় না। জীবন-রক্ত দিয়ে পরিবর্তন এনেছে তারা। এখন রাজপথ নয়, সংসদে বসে যুক্তিপূর্ণ সমাধান চাই। সরকারের উদারতাকে দুর্বলতা ভেবে দেশের ক্ষতি করবেন না। এমন দেশ গড়ুন যেখানে সবাই নিরাপদে, শান্তিতে থাকবে। বিরোধী দলকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, তাদের যুক্তিপূর্ণ মতামত গ্রহণ করতে হবে।
প্রবাদ আছে—দেশ ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস করুন। বিগত সরকার চাটুকার পণ্ডিতদের দিয়ে ইতিহাস বিকৃত করে জাতিকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। শিক্ষাক্ষেত্রে এর আগের বিএনপি সরকারের শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের অবদান জাতি মনে রাখবে।
স্বাস্থ্যসেবায় ডাক্তারদের পেশাদার ও মানবিক হতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের পর অল্প পারিশ্রমিকে জনসেবা করলে দরিদ্ররা উপকৃত হবে। ধর্মের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, পাশাপাশি সব ধর্মের মানুষ সমান সুযোগ পাবে।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে সাবধানে পা ফেলতে হবে। অতীত ভুললে চলবে না, শিক্ষা নেওয়া জরুরি। বিচক্ষণতার সাথে সমস্যা, সম্ভাবনা, ঝুঁকি সবই চিহ্নিত করতে হবে।
পরিশেষে, সাবধানে পা ফেলুন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন পূরণে নিজেকে উৎসর্গ করুন। তাদের কোনো সম্পদ ছিল না, ছিল শুধু দেশ আর মানুষের কল্যাণের স্বপ্ন। জনগণ সেই স্বপ্নই আপনার মধ্যে দেখতে চায়। আপনার জন্য দোয়া ও শুভকামনা।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজকর্ম বিভাগ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা