অনলাইনে ভুয়া হাদিসের ছড়াছড়ি: যাচাইহীন শেয়ারের ভয়াবহ পরিণতি
ফাইল ফটো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইউটিউবে স্ক্রল করলেই প্রায়ই চোখে পড়ে- ‘এই দোয়াটি শেয়ার করলে আজই সুখবর পাবেন’ বা ‘অমুক আমল করলে হাজার বছরের সওয়াব’- এমন নানা চটকদার বার্তা। অনেক সময় আবেগের বশবর্তী হয়ে আমরা এগুলো শেয়ার করি। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে যাচাই ছাড়া কোনো হাদিস বা ধর্মীয় তথ্য প্রচার করা শুধু ভুল নয়; বরং পরকালের আমলনামা ধ্বংস করার মতো ভয়াবহ গুনাহ।
কোরআনের নির্দেশনা: যাচাই বা ‘তাবায়্যুন’
যেকোনো সংবাদ, বিশেষত দ্বীনি বিষয় যাচাই ছাড়া গ্রহণ বা প্রচার না করার জন্য পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে- يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ অর্থ: ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই (তদন্ত) করে দেখবে...।’ (সুরা হুজুরাত: ৬)
এই আয়াত আমাদের শেখায়- সত্যতা নিশ্চিত করা একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। না বুঝে মিথ্যা তথ্য ছড়ালে এর দায়ভার থেকে প্রচারকারীর মুক্তি নেই।
হাদিসে সতর্কবার্তা: রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নামে মিথ্যার পরিণাম
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নামে কোনো মিথ্যা কথা প্রচার করা সাধারণ মিথ্যার মতো নয়। এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে হাদিস- ‘যে ইচ্ছা করে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার আসন বানিয়ে নেয়।’ (সহিহ বুখারি: ১১০; সহিহ মুসলিম: ৩)
অনেকে মনে করেন, ‘আমি তো আর মিথ্যা তৈরি করিনি, শুধু শেয়ার করেছি।’ কিন্তু যাচাই ছাড়া প্রচারকারীকেও শরিয়তে মিথ্যাবাদীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তাই বলে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম: ৫)
সতর্কতা: ভুয়া হাদিস চেনার সাধারণ লক্ষণ
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া সব ধর্মীয় তথ্যই সঠিক নয়। বানোয়াট তথ্য চেনার কিছু সহজ উপায় রয়েছে-
১. অস্বাভাবিক সওয়াব বা প্রতিশ্রুতি: খুব সামান্য আমলে অবিশ্বাস্য সওয়াব বা ‘আজ রাতেই টাকা পাবেন’- এমন পার্থিব লাভের নিশ্চয়তা।
২. রেফারেন্সের অভাব: নির্ভরযোগ্য কোনো হাদিসগ্রন্থের নাম, খণ্ড বা নম্বর উল্লেখ না থাকা।
৩. শেয়ারে চাপ প্রয়োগ: ‘শেয়ার না করলে গুনাহ হবে’ বা ‘দশজনকে না পাঠালে বিপদ হবে’-এমন হুমকিবাচক কথা।
৪. স্বপ্নভিত্তিক দাবি: ‘অমুক ব্যক্তি স্বপ্নে রাসুলুল্লাহ (স.)-কে দেখেছেন এবং তিনি এই বার্তা দিতে বলেছেন’- এমন ভিত্তিহীন বর্ণনা।
সচেতনতা: ‘শেয়ার’ বাটনে ক্লিক করার আগে আপনার কিছু নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব রয়েছে-
১. উৎস নিশ্চিত হওয়া: পোস্টের সাথে বুখারি, মুসলিম বা অন্যকোনো নির্ভরযোগ্য কিতাবের সঠিক রেফারেন্স আছে কি না তা পরখ করা।
২. আলেমদের পরামর্শ: সন্দেহজনক তথ্য দেখলে শেয়ার না করে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশ্বস্ত ইসলামি ওয়েবসাইট থেকে তা যাচাই করে নেওয়া।
৩. সন্দেহ হলে বিরত থাকা: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যা তোমাকে সন্দেহে নিপতিত করে তা ছেড়ে দাও এবং যাতে সন্দেহ নেই তা গ্রহণ করো।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৫১৮)
অনলাইনে দ্বীন প্রচার নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ, কিন্তু তা হতে হবে সত্য ও নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে। আপনার একটি ‘শেয়ার’ যেমন সওয়াবের কারণ হতে পারে, তেমনি অসতর্কতার কারণে তা আপনার চিরস্থায়ী গুনাহের বোঝাও হতে পারে। সুতরাং আবেগ নয়, যাচাইয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই একজন সচেতন মুসলিমের পরিচয়। মনে রাখতে হবে- ‘শেয়ার’ বাটনে ক্লিক করার আগে এক মুহূর্ত ‘যাচাই’ করাই একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব।