মিয়ানমারের সাবেক প্রেসিডেন্টসহ চার সহস্রাধিক বন্দিকে ক্ষমা করলেন হ্লাইং
ফাইল ছবি।
মিয়ানমারে হাজার হাজার বন্দির জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে বা তাদের সাজা কমানো হয়েছে। দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটি তার প্রথম সরকারি সিদ্ধান্তগুলোর একটি। খবর রয়টার্সের।
কারাবন্দি সাবেক নেত্রী অং সান সুচির আইনজীবী জানিয়েছেন, তার সাজা কমানো হয়েছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর আটক সাবেক প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টকেও ক্ষমা করা হয়েছে বলে প্রেসিডেন্টের দফতর জানিয়েছে।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমআরটিভি জানিয়েছে, মিন অং হ্লাইং ৪,৩৩৫ জন বন্দির জন্য সাধারণ ক্ষমা অনুমোদন করেছেন। প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে দেয়া এক বার্তায় বলা হয়েছে, ‘মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপরাধীদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।’
তবে এই বার্তায় সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সব অপরাধীই এই সুবিধাটি পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
আরেক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রেসিডেন্ট হ্লাইং উইন মিন্টকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ এমআরটিভি জানিয়েছে, ‘নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে উইন মিন্টকে ক্ষমা করা হয়েছে এবং তার অবশিষ্ট সাজার মেয়াদ কমানো হয়েছে।’
উইন মিন্ট ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারের দশম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২১ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন।
এর আগে ২০২৩ সালের মে মাসে ৩৮ জন কয়েদীর মৃত্যুদণ্ড তুলে নেয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে এরকম গণহারে শাস্তি কমানোর নজির নেই।
মিয়ানমারের থিংগিয়ান উৎসব (নববর্ষ) উদযাপনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ‘ক্ষমা’ আদেশ দেয় সরকার। মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি কমানোর পাশাপাশি এ বছর মোট চার হাজার ৩০০ কয়েদিকেও মুক্তি দেয়া হচ্ছে। ১৭৯ জন বিদেশি নাগরিকও মুক্তি পাচ্ছেন।
অন্যদের মধ্যে ৪০ বছরের কম কারাদণ্ড পেয়েছেন এমন কয়েদিদের শাস্তি ছয় ভাগের এক ভাগ কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। ওই ঘটনার অল্প সময় পর বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সরকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। কার্যত গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে মিয়ানমার।
এ অবস্থায় সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং-এর নির্দেশে ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার হিড়িক পড়ে যায়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে ১৩০ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তবে এর মধ্যে কতজনের ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা হয়েছে বা প্রকৃত সংখ্যাটি আদৌ আরও বেশি কি না, সেটা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক পাক্ষিক নির্বাচনে সেনা সমর্থিত রাজনৈতিক দল জয়লাভ করে। এরপর গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন সাবেক সেনাপ্রধান।
গণতন্ত্র পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এই নির্বাচন ও মিন অং হ্লাইং-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ কার্যত সেনাশাসনকে বৈধতা দেয়ার শামিল। এটি এক ধরনের ‘ব্র্যান্ডিং’ ছাড়া আর কিছুই না—এমন মত দিয়েছে সংস্থাগুলো।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই ব্র্যান্ডিং উদ্যোগে জান্তা সরকারের কিছু কঠোর নির্দেশনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এগুলো লোক-দেখানো কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। সামরিক সরকারের আমলে যত মানুষ সাধারণ ক্ষমা পেয়ে মুক্তি পেয়েছেন, তাদের ১৪ শতাংশের কম রাজনৈতিক কারণে বন্দি ছিলেন।
অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিকাল প্রিজনার্স নামের সংস্থার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সামরিক অভ্যুত্থানের পর ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে মিয়ানমারের বিভিন্ন কারাগারে আটক আছেন।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মানুষটি হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সুচি। ২৭ বছরের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে তিনি এখনো গৃহবন্দী আছেন। অধিকার সংস্থাগুলোর মতে, রাজনৈতিক কারণেই আটক আছেন সুচি।
জানুয়ারিতে সামরিক জান্তা আয়োজিত নির্বাচনে সুচির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি পার্টিকে অংশ নিতে দেয়া হয়নি। এমনকি দলটির এখন আনুষ্ঠানিক কোনো অস্তিত্বও নেই। অভ্যুত্থানের পর বিশেষ আদেশে সুচির দলকে নিষিদ্ধ করেন জেনারেল হ্লাইং।