চাঁদায় জিম্মি অপরাধীরাও, প্রতিকারের আশায় নগরবাসী
প্রতীকী ছবি
গাজীপুরের শিল্পনগরী টঙ্গীতে ছোট বড় মিলে প্রায় তিন শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। টঙ্গী বিসিকের বাইরেও আছে অনেক কারখানা। ঘনবসতির এই শিল্পাঞ্চলে কয়েক লক্ষ মানুষ বসবাস করেন। কম জায়গায় বেশি মানুষের বসবাস হওয়ায় নাগরিকদের জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ এখন বড় সমস্যা।
তবে ভাসমান মানুষ ও বস্তি বেশি হওয়ায় অপরাধের আঁখড়া এখন টঙ্গী। চুরি-ডাকাতি ছিনতাই ও মাদকের ব্যবসার মতোই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজি। এই সকল অপরাধের আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতারা চাঁদাবাজিতে অপরাধীদের জিম্মি করে রাখায় অপরাধ দমনে তেমন কোনো সফলতা আসছে না। ক্ষমতার পালাবদলে চাঁদাবাজদের ঠিকানা শুধু পরিবর্তন হয় কিন্তু চাঁদাবাজদের হাত থেকে অপরাধ ও অপরাধীরা বের হতে পারে না।
ফলে কমছেই না অপরাধ। দিন দিন হু হু করে বাড়ছে অপরাধীর সংখ্যা ও নতুন নতুন অপরাধ। আর নতুন অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও হিমশিম খাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সময়ের তাগিদে টঙ্গীতে ১৯টি বস্তি গড়ে উঠেছে।
এ সকল বস্তিতে দুই লাখের বেশি ভাসমান মানুষ বসবাস করেন। নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসস্থল বস্তি এলাকা হওয়ায় অনেকের পেশা অস্পষ্ট। এই অস্পষ্ট পেশার মানুষগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে অপরাধে। মাদক ও ছিনতাই বস্তিবাসীদের প্রধান পেশা। ঢাকার টঙ্গীর বস্তি এখন মাদকের পাইকারী বাজার।
প্রচলিত আছে, টঙ্গীর বস্তিগুলো থেকে সারা দেশে মাদক সরবরাহ করা হয়। আর টঙ্গীতে মাদক আসে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে। ফলে টঙ্গী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের মাদকের বাজার। এই বাজারের নিরাপত্তা দিতে কাঁচা টাকার বিনিময়ে প্রভাবশালীরা মাদক কারবারিদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিচ্ছেন। সব সরকারের আমলে টঙ্গীর মাদকের বাজার রমরমা থাকে। কারণ মাদকের গডফাদাররা পরিবর্তন হয় মাত্র কিন্তু মাদক কারবারিদের কোনো পরিবর্তন হয় না। ফলে মাদক ব্যবসা নিরাপদ পেয়ে দিন দিন মাদকেই ঝুঁকছে বেকার মানুষেরা।
এদিকে টঙ্গীতে ছোট বড় প্রায় তিন শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এই সকল কারখানায় ঝুট ব্যবসাসহ নানা ধরনের ব্যবসা রয়েছে, যা থেকে কাঁচা টাকা আয় হয়। ফলে সব সরকারের আমলেই এ লাভজনক ব্যবসার অংশিদার হতে মানুষের ভিড় পড়ে যায়। নতুন সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে একশ্রেণির লোক শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার জন্য এক দল ছেড়ে অন্য দলে চলে যায়। শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাঁচা টাকার পাশাপাশি ফুটপাতের ব্যবসায়ও জড়িয়ে পড়েন তারা। ফুটপাত বসিয়ে দৈনিক চাঁদা আদায় করে তারা রাতারাতি বড় লোক হয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকেন। আরেকশ্রেণির লোক পরিবহন খাতে ও বিভিন্ন স্ট্যান্ডে চাাঁদাবাজি করেন সুকৌশলে। মাদক, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি সবই গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে। পাশাপাশি জমি দখল, বেদখল ও জমিতের নতুন স্থাপনা হওয়ার সময় চাঁদা আদায় এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। কেউ নতুন বাড়ি করলে চাঁদা না দিয়ে বাড়ির কাজ শুরু করতে পারে না। চাঁদা না দিলে বাড়ির কাজের মালামাল ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এসব বিষয় পুলিশকে জানালে সমস্যা আরো বেড়ে যায় ফলে নীরবে চাঁদা দিয়েই বাড়ি ঘরের কাজ করেন সাধারণ মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ সকল অবৈধ আয় থেকে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের খরচও জোগান দেওয়া হয়। নেতারা শুধু মিটিং মিছিলে কে কতজন লোক আনবে বলে দেয় আর ছোট ছোট নেতারা লোক নিয়ে রাজনৈতিক সমাবেশে হাজির হয়। সূত্র বলছে, যখন যে সরকার আসে সেই সরকারি দলের সভা সমাবেশে একই লোকরা অংশগ্রহণ করেন। শুধু স্লোগান শিখিয়ে দেওয়া হয়। যখন যে স্লোগান শিখিয়ে দেওয়া হয় তখন সেই স্লোগানই দেয় তারা।
টঙ্গীর মধুমিতা রোডের বাসিন্দা জাকির হোসন জানান, ছিনতাইকারীদের ভয়ে রাতের বেলায় বাইরে যাই খুব কম। শুধু রাতে নয়, এখন দিনেও ছিনতাই ও চুরি হয়। আমরা প্রতিকার চাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ফুটপাতের দোকানদাররা বলছেন, আমরা চাঁদা দিয়ে বসি। পুলিশ মাঝে মাঝে তুলে দিলেও আবার বসতে সমস্যা হয় না।
এ সকল বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, মাদক ও চাঁদাবাজ ধরলেই নেতাদের তদবির আসা শুরু হয়। দিনের বেলায় যে সকল নেতারা মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মঞ্চ কাঁপিয়ে বক্তব্য দেন তাদের অনেকেই এদের পক্ষে তদবির করেন। অপরাধ দমনে রাজনৈতিক নেতাদের মঞ্চের বক্তব্য মঞ্চ থেকে নামার পর ঠিক থাকলে অপরাধ দমন সহজ হবে। পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীরও কিছু সদস্য মাদক কারবারিদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। অনেক সদস্য মাদকের আসক্ত বলে প্রায়ই কথা উঠে।
এ সকল বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ জিএমপির অপরাধ দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যদি মাদকের সঙ্গে জড়িত বা মাদক সেবন করেন। তবে অভিযোগ সাপেক্ষে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা এসব অভিযোগ করেন তাদের লিখিতভাবে অভিযোগ জানাতে আহবান জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।