রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের থাবা: আক্রান্ত শতাধিক, মৃত্যু ৩
সংগৃহীত
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে গত ৪ মাসে ক্যাম্পগুলোতে ৩৩০ জনেরও বেশি সম্ভাব্য এবং ৪০ জন ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় কক্সবাজারে নিজেদের চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করেছে মেডিসিন্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ)। সংস্থাটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীতে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের পাশাপাশি চলমান টিকাদান কর্মসূচিতেও সহায়তা করছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাতে এক বার্তায় এমএসএফ’র পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
এমএসএফ জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ৬৪টি জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে বিশ্বের বৃহত্তম আশ্রয়শিবিরে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করেন- যারা হামের সংক্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এখানকার ঘনবসতিপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রার কারণে রোগটি, নাজুক অবস্থায় থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
হেলথ সেক্টরের তথ্য অনুযায়ী, শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে এখন পর্যন্ত ৩৩০ জনেরও বেশি সম্ভাব্য এবং ৪০ জন ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝেও প্রায় ১৬০ জন রোগী পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে জেলায় নিয়মিত হামের সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু মার্চ মাস থেকে ব্যাপক বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছি এবং এপ্রিলে তা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে,” বলেছেন এমএসএফ-এর কান্ট্রি মেডিকেল কোঅর্ডিনেটর মিকে স্টেনসেন্স।
তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য আমাদের টিম ক্যাম্পের ভেতরে এবং বাইরে উভয় স্থানেই তৎপর রয়েছে। আক্রান্তদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অনেকের মধ্যেই গুরুতর নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। শুধুমাত্র এপ্রিল মাসেই এমএসএফ কক্সবাজারে তাদের বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে ২৮৪ জন হামে আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে-যা বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চারগুণ বেশি। এর মধ্যে ৮২ জনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। ১৯ এপ্রিল আমরা জামতলী ক্যাম্পে একটি নতুন আইসোলেশন ইউনিট চালু করেছি, যা সব ক্যাম্পের জন্য একটি রেফারেল সেন্টার হিসেবে কাজ করছে, বলেছেন মিকে স্টেনসেন্স। এটি ইতিমধ্যে এর পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছেছে এবং আমরা এর শয্যা সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
আক্রান্তদের মধ্যে সঙ্কটাপন্ন রোগীর অনুপাত উদ্বেগজনক। গয়ালমারা মা ও শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীদের ৪০ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকজনের নিবিড় পরিচর্যার (ইনটেনসিভ কেয়ার) দরকার ছিল। কুতুপালং হাসপাতালেও ২০ দিনের ব্যবধানে ভর্তি হওয়া ৭১ জন রোগীর মধ্যে ১৫ জনকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছে।
ক্যাম্পের অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাত্রা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিলেও, ক্যাম্প ও স্থানীয় এলাকায় টিকার নিম্ন হারই এখন প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্যাম্পগুলোতে ল্যাবরেটরি-নিশ্চিত হামের রোগীদের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশই টিকা নেননি, বলেন স্টেনসেন্স। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা না নেওয়া শিশুদের হারও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি।
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে, ২৬ এপ্রিল থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শুরু হওয়া টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা দিয়েছে এমএসএফ। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে ছড়ায়। এটি মূলত শিশুদের আক্রান্ত করে এবং বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ থাকা জনাকীর্ণ পরিবেশে নিউমোনিয়া, পুষ্টিহীনতা ও মৃত্যুর মতো গুরুতর জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং অত্যন্ত কার্যকর টিকার দুটি ডোজের মাধ্যমে এই রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব,” বলেন স্টেনসেন্স। “তবে, এই প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করার জন্য অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকাদানের আওতায় আনা প্রয়োজন। আমরা যেমনটা দেখছি, ক্যাম্প এবং পাশের উভয় জনবসতিতেই এই হার অনেক কম। পরিস্থিতি অনুযায়ী গণ-টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতেও টেকসই বিনিয়োগ অপরিহার্য-একটি ছাড়া অন্যটি সফল হওয়া সম্ভব নয়।
কক্সবাজারে এমএসএফ রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং এর আশপাশে বেশকিছু সেবাকেন্দ্রে হামে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জামতলী ও হাকিমপাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ‘হসপিটাল অন দ্য হিল’, কুতুপালং হাসপাতাল এবং গয়ালমারা মা ও শিশু হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি চিকিৎসা কেন্দ্র। ১ জানুয়ারি থেকে আমাদের টিম হামের উপসর্গে আক্রান্ত বা নিশ্চিত হওয়া ৩৫০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে, যাদের মধ্যে ১০৩ জনের শারীরিক জটিলতা ছিল। এছাড়া এমএসএফ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বর্তমানে চলমান ১০ দিনব্যাপী হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতেও সহায়তা করছে।