পানির আড়ালে প্রাণঘাতী অ্যামিবা, বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কতা
সংগৃহীত ছবি
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা বিশ্বজুড়ে এক নতুন ও অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘বায়োকন্টামিন্যান্ট’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে জানানো হয়েছে, আণুবীক্ষণিক জীব ‘মুক্তজীবী অ্যামিবা’ আমাদের অজান্তেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পুরনো পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে এই বিপদ আরো ঘনীভূত হচ্ছে।
অ্যামিবা হলো এক প্রকার এককোষী ক্ষুদ্র জীব, যা সাধারণত মাটি ও মিঠা পানিতে বাস করে।
এদের অধিকাংশ প্রজাতি ক্ষতিকর না হলেও কিছু প্রজাতি মানুষের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ‘নেগলেরিয়া ফাউলেরি’, যাকে সংক্ষেপে ‘মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা’ বলা হয়।
দূষিত পানি নাকে প্রবেশ করলে এই ক্ষুদ্র জীবটি সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। এটি দ্রুত মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করে ফেলে, যা প্রায় ৯৯% ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হয়।
সান ইয়াত সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লংফেই শু জানিয়েছেন, এই অ্যামিবাগুলো অত্যন্ত সহনশীল। এদের নির্মূল করা কঠিন হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো :
১। তীব্র সহনশীলতা : এরা উচ্চ তাপমাত্রা ও ক্লোরিনের মতো শক্তিশালী জীবাণুনাশকও অনায়াসে সহ্য করতে পারে।
২।
নিরাপদ আশ্রয় : আমাদের সরবরাহ করা পানির পাইপের ভেতরেও এরা দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে।
অ্যামিবার ভেতর ‘ট্রোজান হর্স’ এফেক্ট
বিজ্ঞানীরা একটি বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন—অ্যামিবা শুধু নিজে বিপজ্জনক নয়, বরং এটি অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের জন্য ‘আশ্রয়দাতা’ হিসেবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘ট্রোজান হর্স’ প্রভাব। অ্যামিবার শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থেকে অন্য রোগজীবাণুগুলো পানি পরিশোধনের রাসায়নিক থেকে বেঁচে যায়। এর ফলে এরা শুধু টিকেই থাকে না, বরং আরো শক্তিশালী ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি
বিশ্বের তাপমাত্রা যত বাড়ছে, এই অ্যামিবাগুলোর বিস্তারও তত বাড়ছে। আগে যে অঞ্চলগুলোতে এদের দেখা মিলত না, এখন সেই শীতল অঞ্চলের পানিতেও উষ্ণতা বাড়ার ফলে এই জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। মূলত হ্রদ বা অপরিষ্কার জলাশয়ে সাঁতার কাটার সময় মানুষ এই সংক্রমণের শিকার হচ্ছে।
সমাধানের পথ কী?
গবেষকরা এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির ওপর জোর দিয়েছেন। এর মূল দিকগুলো হলো :
উন্নত পর্যবেক্ষণ : পানির উৎস ও সরবরাহব্যবস্থায় নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো।
আধুনিক প্রযুক্তি : অ্যামিবা শনাক্ত করতে দ্রুত ও নির্ভুল রোগনির্ণয় যন্ত্রের উদ্ভাবন।
সমন্বিত পদক্ষেপ : পরিবেশ বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং পানিব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে কাজ করা।
খালি চোখে দেখা যায় না এমন এই ক্ষুদ্র জীবটি বর্তমান বিশ্বের জন্য এক নীরব ঘাতক। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে এখনই যদি পানি শোধন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যসংকটের কারণ হতে পারে।
সূত্র : সায়েন্স ডেইলি