আর্থিক চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা চাইল ‘সিটি গ্রুপ’
আর্থিক চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা চাইল ‘সিটি গ্রুপ’।। ছবিঃ সংগৃহীত।
প্রতিষ্ঠার পর ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করা গ্রুপটি এখন আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় নানা সংকটের কারণে গ্রুপের কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চেয়ে লিখিত আবেদন করেছে গ্রুপটি। আবেদনে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণ (খেলাপি) না করাসহ সাত ধরনের নীতিসহায়তা চাওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বরাবর লেখা আবেদনে সিটি গ্রুপ উল্লেখ করেছে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো খেলাপি হয়নি। এমনকি ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধেও কোনো বিলম্ব ছিল না। কিন্তু চার বছর ধরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের প্রভাবে গ্রুপটি তীব্র আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপের মুখে পড়েছে। এটি সিটি গ্রুপের নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। এ কারণে গ্রুপটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চাইতে বাধ্য হয়েছে।
সিটি গ্রুপের চিঠিতে ৩৪টি ব্যাংক ও পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম সারির ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি কয়েকটি বিদেশী ব্যাংকের নামও রয়েছে। মোট ৩৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন থাকা সিটি গ্রুপের ২৪টি কোম্পানির ঋণ পরিশোধের বিষয়ে এ চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। আবেদনে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৪৫(১)(এ) ও (বি) এবং ধারা ৪৯(১)(বি) ও (এফ) অনুসারে গভর্নরের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। এক্ষেত্রে জনস্বার্থ, খাদ্যনিরাপত্তা, মূল্য স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশ জুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর সরাসরি প্রভাবের বিষয় উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিটি গ্রুপের ব্যবসার বড় অংশ ভোগ্যপণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত। গত চার বছরে দেশে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় সিটি গ্রুপ বিপুল ক্ষতির শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৪-৫ শতাংশ বেড়েছে। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে আমরা ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে ছয়টি বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছি। কিন্তু এখনো গ্যাসের সংযোগই দেয়া হয়নি। বিষয়গুলো জানিয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তা চেয়েছি।’
নীতিসহায়তা চাওয়া প্রসঙ্গে মো. হাসান আরো বলেন, ‘গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সিটি গ্রুপ সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করেছে। কিন্তু এখন যেসব কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই আমাদের সৃষ্ট নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু নীতিসহায়তা দিলে সিটি গ্রুপের পাশাপাশি দেশের ব্যাংক ও অর্থনীতি লাভবান হবে।’
সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রয়াত হন। কর্মস্পৃহা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য এ শিল্প উদ্যোক্তা দেশের ব্যাংকিং ও করপোরেট জগতের চোখে এক সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দেশের শিল্পায়নে তার অবদানকে স্মরণ করেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাধীনতা-পরবর্তী পাঁচ দশকে সিটি গ্রুপের অংশ হিসেবে ৪০টিরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ভোজ্যতেল ও চিনি পরিশোধন, চাল-ডাল, আটা-ময়দা, প্রক্রিয়াজাত খাবার, পোলট্রি খাদ্য, জাহাজ নির্মাণ, চা বাগান, ব্যাংক ও বীমা, হাসপাতালসহ বিভিন্ন খাতে এ গ্রুপের ব্যবসা বিস্তৃত। এ গ্রুপের তিনটি অর্থনৈতিক জোন ও একটি হাই-টেক পার্কও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে লেখা সিটি গ্রুপের আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে সিটি গ্রুপ ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা রেখে আসছে। তবে নীতিনির্ভর সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবে সৃষ্ট চাপ সিটি গ্রুপের ওপর ব্যতিক্রমধর্মী আর্থিক সংকট সৃষ্টি করেছে, যা গ্রুপের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সময়োপযোগী নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপকে অপরিহার্য করে তুলেছে। বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর একটি হিসেবে সিটি গ্রুপ সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ—বিশেষত টিসিবি কর্মসূচির আওতায়—বিশ্বস্ত সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে সারা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সাশ্রয়ী মূল্য ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ‘তীর’, ‘সান’ ও ‘ন্যাচারাল’সহ পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মাধ্যমে গ্রুপটি জাতীয় চাহিদার একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোজ্যতেল, ৪০ শতাংশ চিনি, ২৫ শতাংশ আটা সরবরাহ এবং বিস্তৃত সরবরাহকারী ও পরিবেশক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা বার্ষিক টার্নওভারের সিটি গ্রুপ সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি কৃষক, সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি বৃহৎ ইকোসিস্টেমকে টিকিয়ে রাখছে। দেশব্যাপী ১ হাজার ৫০০ সরবরাহকারী, ৩ হাজার ৫০০ পরিবেশক এবং ১০ লক্ষাধিক খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী এ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত।
চিঠিতে বলা হয়, যেহেতু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বড় অংশই নিয়ন্ত্রিত, জনস্বার্থের এ লক্ষ্য বজায় রাখতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে আমরা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ ভোক্তাদের ওপর আরোপ করতে পারিনি, ফলে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। গ্রুপটি দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে প্রতিফলিত করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঋণ পরিশোধে কোনো ধরনের খেলাপি না হওয়ায় এটি অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে একটি বিশ্বস্ত নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তবে গত চার বছরে অভূতপূর্ব সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও খাতভিত্তিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মিলিত প্রভাবে গ্রুপটি তীব্র আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপের মুখে পড়েছে, যা তার তারল্য ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।
বৈশ্বিক ও জাতীয় যেসব পরিস্থিতির কারণে সিটি গ্রুপ বিপদে পড়েছে, সেগুলো চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, গত চার বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার প্রায় ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২২ টাকায় পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রায় ৪২% অবমূল্যায়ন ঘটেছে। গ্রুপটি যেহেতু স্বল্পমেয়াদি ডলারভিত্তিক অর্থায়নের (ইউপাস এলসি) মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তাই এ তীব্র অবমূল্যায়নের ফলে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রাজনিত ক্ষতি হয়েছে, যা নগদ প্রবাহের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া অনুমোদিত ঋণ সুবিধাগুলো টাকায় নির্ধারিত হলেও আমদানি ডলারে করতে হওয়ায় প্রকৃত অর্থে সিটি গ্রুপের আমদানি সক্ষমতা ৪২% কমে গেছে। একই টাকার সীমায় এখন আগের তুলনায় অনেক কম পরিমাণ পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে। এ অবমূল্যায়নের কারণে অনুমোদিত টাকার ঋণ সুবিধার ডলার সমমান প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকায় এ কার্যকর সক্ষমতা হ্রাস আমাদের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের এলসি খোলার সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করেছে। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক মাত্রায় রাখা এবং সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত কয়েক বছরে দেশের ব্যাংক খাতে সুদের হার বৃদ্ধির কারণেও সিটি গ্রুপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দেশের ব্যাংকগুলো থেকে দেশীয় মুদ্রায় ঋণের সুদহার ৪-৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। আর ডলারে নেয়া ঋণের সুদহার ২০২২ সালে ৩-৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৯-১০ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি এলসি খোলা ও নিশ্চিতকরণ খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পণ্য আমদানির জন্য ডলারভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ডলারের সুদের হার বৃদ্ধিতে অর্থায়ন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং টাকার অবমূল্যায়ন এ ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে টাকায় ঋণের প্রাপ্যতা কমেছে, এলসি নিশ্চিতকরণ চার্জ বেড়েছে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার পরিস্থিতির কারণে এ বাড়তি ব্যয় পুরোপুরি ভোক্তাদের ওপর আরোপ করা সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ পরিচালন মুনাফার মার্জিন উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং নগদ প্রবাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রায় ছয় বছর আগে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় ‘হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তুলেছিল ‘সিটি গ্রুপ’। মেঘনা নদীর তীরে ১০৮ একর জমিতে গড়ে তোলা এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছয়টি বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছে গ্রুপটি। এক্ষেত্রে গ্রুপটির বিনিয়োগ ছিল ১০-১২ হাজার কোটি টাকা। এত বিপুল বিনিয়োগে গড়ে তোলা কারখানাগুলো এখন অলস পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত গ্যাস বরাদ্দের ভিত্তিতে কারখানা গড়ে তুললেও এখনো গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়নি। উৎপাদনে যেতে না পারায় গ্রুপটি এখন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে চাপে পড়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের উৎপাদন ইউনিটগুলোতে গ্যাসের অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত সরবরাহ বিদ্যমান, যা উৎপাদন দক্ষতা ও সক্ষমতার ব্যবহারকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত গ্যাস বরাদ্দের ভিত্তিতে গ্রুপটি হোসেন্দী ইকোনমিক জোনে ছয়টি বৃহৎ শিল্প ইউনিট স্থাপন করেছে। কিন্তু কয়েক বছর অপেক্ষা করার পরও এখনো সেখানে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়নি। কিছু কারখানা সম্পূর্ণ প্রস্তুত, আর কিছু প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ মূলধনি বিনিয়োগ কোনো আয় ছাড়াই স্থবির অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ অর্থায়ন ব্যয় চলমান রয়েছে এবং কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে।
দেশের ব্যাংক খাতে চলমান তারল্য সংকটের প্রভাবও সিটি গ্রুপের ওপর পড়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, দেশের প্রধান ব্যাংকগুলোয় টাকা ও ডলারের তারল্য সংকট দেখা দেয়ায় এলসি খুলতে বিলম্ব হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহকারীরা এলসি গ্রহণ করছে না। পাশাপাশি পরিবেশকরাও ঋণ সংকটে পড়ায় পাওনা আদায়ে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে এলসি কনফারমেশন পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, বিশেষ করে পর্যবেক্ষণে থাকা স্থানীয় ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে। ফলে ফি বেড়েছে, নিশ্চিত এলসির সংখ্যা কমেছে এবং আমদানিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। বড় ঋণদাতাদের ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রক সীমা নতুন ঋণ প্রদান ও এলসি খোলাকে আরো সীমিত করেছে। ফলে আমদানি অর্থায়ন ও কার্যকর মূলধন ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা কমে গেছে। এসব কারণে বিদ্যমান ঋণ সুবিধার কার্যকর প্রাপ্যতা আরো প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার কমে গেছে বলে দাবি করেছে গ্রুপটি।
সৃষ্ট সংকট উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সাত ধরনের নীতিসহায়তা চেয়েছে সিটি গ্রুপ। এ বিষয়ে আবেদনে বলা হয়, ঋণদাতা ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দেশনা প্রদান করা, যাতে তারা চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান ঋণগুলো শ্রেণীকরণ (খেলাপি) না করে। ব্যাংকগুলো যাতে চলতি মূলধন সুবিধা অব্যাহত রাখে এবং নিয়মিত পরিশোধের শর্তে ‘ইউসি’ (নিয়মিত) মর্যাদা বজায় রেখে শূন্য মার্জিনে অতিরিক্ত কার্যকর মূলধন সহায়তা প্রদান করে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একক গ্রুপভিত্তিক ঋণসীমা অতিক্রমের অনুমতি প্রদানেরও সুযোগ চেয়েছে গ্রুপটি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর জন্য মোট একক ঋণগ্রহীতার (ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড উভয় সুবিধাসহ) সর্বোচ্চ সীমা রেগুলেটরি মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া ঋণের সুদহার ঋণদাতার তহবিল ব্যয়ের সঙ্গে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ (অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এক অংকে) নির্ধারণ করা এবং কোনো ধরনের জরিমানা সুদ আরোপ না করার অনুরোধ করেছে গ্রুপটি।
আবেদনে শূন্য শতাংশ মার্জিনে অতিরিক্ত চলতি মূলধন, এলসি সুবিধা প্রদান এবং নিয়মিত পরিশোধের ভিত্তিতে ‘ইউসি’ মর্যাদা বজায় রাখার অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, সিটি গ্রুপ সামগ্রিক ঋণ পোর্টফোলিও পর্যালোচনার জন্য আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং (ইওয়াই) নিয়োগ করেছে, যা সম্পন্ন হতে প্রায় তিন মাস সময় লাগবে। ইওয়াইয়ের মূল্যায়ন ও সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা একটি বিস্তারিত ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করব এবং ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের শুরুর দিকে প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পরবর্তী দিকনির্দেশনার জন্য উপস্থাপন করব।
কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি সিটি গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ঋণ পরিশোধসূচি পুনর্নির্ধারণ করতে চায়, সেক্ষেত্রে বকেয়া ঋণের ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে গ্রহণের অনুমতি প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে গ্রুপটি। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারীকৃত বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নং ৫০ অনুসারে টার্ম লোন সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এ বিষয়ে বলা হয়, ওই সুবিধার আওতায় গ্রুপটি ১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা পাওয়ার যোগ্য, যা ২০২২ সালে সংঘটিত ২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ক্ষতির ৮০ শতাংশ। প্রযোজ্য নির্দেশিকা অনুসারে গ্রুপটি যথাযথভাবে আবেদন করলেও অধিকাংশ ব্যাংক এখনো এ সহায়তা প্রদান করেনি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চাওয়ার পাশাপাশি সংকট থেকে উত্তরণে নিজেদের কিছু উদ্যোগের কথাও আবেদনে তুলে ধরেছে সিটি গ্রুপ। এ বিষয়ে বলা হয়, গ্রুপটি এরই মধ্যে অপ্রধান (নন-কোর) কিছু ব্যবসায়িক ইউনিট বিক্রি বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সম্ভাবনা মূল্যায়ন ও অনুসন্ধান শুরু করেছে। দেশীয় ও বিদেশী কৌশলগত অংশীদার, প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগকারী এবং নির্বাচিত ব্যবসা ইউনিটকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে নতুন ইকুইটি সংগ্রহের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা, ঋণ-ইকুইটি অনুপাত উন্নত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণনির্ভরতা কমানোই লক্ষ্য। চলতি মূলধনের সহায়তায় উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়াও অব্যবহৃত বা আংশিক ব্যবহৃত সক্ষমতাকে কনট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে ভাড়া দিয়ে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন স্থাপনাগুলো পূর্ণমাত্রায় চালু না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। সরকারি গ্যাস সরবরাহ শিগগির পাওয়া না গেলে, হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন শিল্প ইউনিটগুলো সচল রাখতে এসএনজি (সিনথেটিক ন্যাচারাল গ্যাস) সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সিটি গ্রুপ। পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে আগামী তিন বছরের মধ্যে গ্রুপটির টেকসই আর্থিক পুনরুদ্ধার ও উন্নত ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়।