কাপাসিয়ায় একই পরিবারের ৫ জনকে হত্যার ঘটনায় আটক ২
প্রতিকি ছবি
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় মা, তার তিন সন্তান ও ভাইসহ একই পরিবারের ৫ জনকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। আজ শনিবার সকালে কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে তাদের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে নিহত গৃহবধূর স্বামী মো. ফোরকান পলাতক রয়েছেন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পারিবারিক কলহের জেরে ফোরকান এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারেন।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহতরা হলেন, ফোরকানের স্ত্রী শারমিন খানম (৩৫), তাদের বড় মেয়ে মীম খানম (১৪), মেজ মেয়ে উম্মে হাবিবা (৮) ও ছোট মেয়ে ফারিয়া (২) এবং শ্যালক রসুল মিয়া (২২)। নিহত শারমিন গোপালগঞ্জ জেলা সদরের পাইকান্দি এলাকার শাহাদত মোল্লার মেয়ে।
নিহত শারমিনের স্বামী মো. ফোরকান (৪০) গোপালগঞ্জ জেলা সদরের মেরি গোপীনাথপুর গ্রামের আতিয়ার রহমানের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পলাতক ফোরকান মিয়া পেশায় প্রাইভেট কার চালক। তিনি বছর খানেক আগে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলা ভাড়া নিয়ে স্ত্রী সন্তানসহ বসবাস করছিলেন। শুক্রবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। শনিবার সকালে ঘরের ভেতর লাশগুলো পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়।
কাপাসিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। শনিবার বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্নের প্রস্তুতি চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, শনিবার সকালে প্রতিবেশীরা বাড়িতে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে রক্তাক্ত লাশগুলো পড়ে থাকতে দেখেন। তিন সন্তানের গলাকাটা লাশ ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়েছিল। শারমিনের ভাই রসুল মিয়ার লাশ ছিল বিছানার ওপর।
অন্যদিকে শিশুদের মা শারমিনের লাশ জানালার গ্রীলে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় ঝুলে থাকতে দেখা যায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ভিড় করেন।
ঘটনার পর থানার পুলিশ, ডিবি পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআইসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থল ঘিরে রাখে। বাসার ভিতরে ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা আলামত সংগ্রহের কাজ করেন।
ওই বাড়ির আশপাশের লোকজন জানায়, প্রায় ছয় মাস আগে থেকে ফোরকান রাউৎকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতে থাকে। এখানে আসার পর থেকে ফোরকান ও শারমিনের মাঝে পারিবারিক কলহের জেরে প্রায়ই মারামারির ঘটনা ঘটতো। রাত একটার দিকে ফোরকান নিজেই তার ছোট ভাই মিশকাতকে ফোনে স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করার বিষয়টি জানিয়ে স্বজনদেরকে লাশ নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়। গভীর রাতে শারমিনের স্বজনরা ফোনে এই হত্যাকাণ্ডের খবর শুনতে পান। পরে শনিবার খুব ভোরে তারা ওই বাড়িতে এসে দরজা হালকা খোলা পেয়ে ঘরে গিয়ে সবার লাশ দেখতে পান। এ সময় তারা ৯৯৯ এ ফোন করে বিষয়টি জানান এবং কাপাসিয়া থানায় বিষয়টি জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।
কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম জানান, প্রাথমিকভাবে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খবর নিয়ে জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জেরে শুক্রবার গভীর রাতের কোনো এক সময় ওই পাঁচজনকে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যার পর অভিযুক্ত স্বামী ফোরকান পালিয়ে গেছে। শনিবার সকালে নিহতের পরিবারের এক সদস্যকে ফোন করে বিষয়টি জানান।
তিনি আরও জানান, লাশ উদ্ধারের সময় লাশের পাশে পড়ে থাকা গোপালগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জের বরাবরে লিখিত স্বাক্ষর ও তারিখবিহীন একটি লিখিত অভিযোগপত্র পাওয়া গেছে। এতে মো. ফোরকান তার স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ ১১ জনের নামোল্লেখ করে এবং আরও ৪-৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন।
লিখিত অভিযোগে সে দাবি করে তার শ্বশুর তার উপার্জনের ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে স্থানীয় এলাকায় জমি কিনেছেন। তিনি এখন সেই টাকা পরিশোধ করছেন না। তাছাড়া শারমিন বেশ কিছু দিন যাবত পরিকীয়ায় আসক্ত বলে ওই অভিযোগে দাবি করে সে। বিষয়টি সে তার মেঝো মেয়ের কাছ থেকে জানতে পেরে শারমিনকে জিজ্ঞেস করলে গত ৩ মে তাকে মারাত্মক শারীরিক নির্যাতন করে। তাই এসব ঘটনায় সে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়। এই অভিযোগের কপি ও তার স্বজনদের সাথে কথা বলে শারমিন ও ফোরকান দম্পতির পারিবারিক কলহের কারণেই এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, কাপাসিয়ার আমরাইদ এলাকা থেকে গাড়ি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ফোরকানের ঘনিষ্ঠ দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে মাদক সেবনের বেশ কিছু আলামতও জব্দ করেছে পুলিশ।
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাপাসিয়া ও কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান জানান, উদ্ধার হওয়া অভিযোগের কপিগুলো এবং পারিপার্শ্বিক আলামত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে কী কারণে এবং আরও কেউ এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত কিনা তা উদ্ঘাটনে পুলিশ, পিবিআই, ডিবি, সিআইডি একযোগে কাজ শুরু করেছেন। বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। পলাতক ফোরকানকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন বলেন, কাপাসিয়ায় ৫ জনকে জবাই করে হত্যা করেছে। খবর জানার সাথে সাথে পুলিশ, সিআইডি ও অন্যান্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
একই পরিবারের ৫ জনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ ঘটনার খবর পেয়ে গাজীপুর-৪ আসনের (কাপাসিয়া) সংসদ সদস্য মো. সালাহউদ্দিন আইউবী, গাজীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ রিয়াজুল হান্নান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার তামান্না তাসনীমসহ জেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।