পশু মোটাতাজাকরণে ইনজেকশন: ইবাদত নাকি প্রতারণা?

পশু মোটাতাজাকরণে ইনজেকশন: ইবাদত নাকি প্রতারণা?

ফাইল ফটো

কোরবানি এমন ইবাদত, যাতে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় ও সর্বোত্তম সম্পদ উৎসর্গ করা হয়। কোরবানিদাতার চেষ্টা থাকে সবচেয়ে সুন্দর ও হৃষ্টপুষ্ট পশুটি আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার; স্বয়ং নবী করিম (স.)-এর সুন্নাহও ছিল তেমন। তবে এই চাহিদাকে পুঁজি করে বর্তমানে পশু মোটাতাজাকরণের ক্ষেত্রে অসাধু ও ক্ষতিকর পদ্ধতির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা শরিয়ত ও মানবিক উভয় দিক থেকেই অস্বস্তির কারণ। তাই প্রশ্ন ওঠে- কোন ধরনের মোটাতাজাকরণ বৈধ, আর কোনটি শরিয়তবিরোধী?

উত্তম পশু কোরবানির উৎসাহ

কোরবানির পশু হিসেবে মোটাতাজা, সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান পশু নির্বাচন করা উত্তম। হজরত আয়েশা (রা.) ও হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) যখন কোরবানি করার ইচ্ছা পোষণ করতেন, তখন তিনি বড়সড়, হৃষ্টপুষ্ট (মোটা), শিংবিশিষ্ট, সুশ্রী সাদা-কালো এবং খাসি করা দুটি ভেড়া ক্রয় করতেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২২)

এ থেকেই বোঝা যায়, ভালো ও স্বাস্থ্যবান পশু কোরবানি করা সুন্নাহসম্মত।

বৈজ্ঞানিক মোটাতাজাকরণ কী?

কোরবানির পশু ও দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পশু মোটাতাজাকরণ কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের একটি পরিচিত পদ্ধতি। সরকার ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরও খামারিদের জন্য বৈজ্ঞানিক খাদ্য ফর্মুলা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি হলো ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (ইউএমএস)। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত মাত্রায় ইউরিয়া খড়, ভুসি ও মোলাসেসের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো হলে তা পশুর পাকস্থলীর অণুজীবের মাধ্যমে প্রোটিনে রূপান্তরিত হয়ে পুষ্টি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর নয়।

ইসলামের মূলনীতি

ইসলামের মূলনীতি হলো- যা মানুষ বা প্রাণীর ক্ষতির কারণ হয়, তা নিষিদ্ধ। ফকিহরা বলেন, কোনো খাদ্য বা উপাদান যদি মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়, তাহলে তা বৈধ হবে না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহারে ক্ষতি না হলে তা বৈধতার মধ্যেই থাকবে।

কোন মোটাতাজাকরণ বৈধ?

প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণ শরিয়তসম্মত। যেমন ঘাস, খড়, ভুসি, খৈল ও ভুট্টাভিত্তিক সুষম খাদ্য; অনুমোদিত ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ; ইউএমএস-এর মতো বৈজ্ঞানিক খাদ্য পদ্ধতি; নিয়মিত পরিচর্যা ও পরিষ্কার পরিবেশ এবং ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ ওষুধ ব্যবহার।

কোনটি প্রতারণা ও শরিয়তবিরোধী?

স্টেরয়েড ও ক্ষতিকর ইনজেকশন: দ্রুত ওজন বাড়ানোর জন্য স্টেরয়েড বা হরমোন ইনজেকশন ব্যবহার করা হলে পশুর শরীরে অস্বাভাবিক পানি জমে ফুলে যায়। বাইরে থেকে মোটা দেখালেও পশু প্রকৃতপক্ষে অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি স্ট্রোক করে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

অতিরিক্ত পানি ও লবণ খাওয়ানো: হাটে নেওয়ার আগে সাময়িকভাবে ওজন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এটি করা প্রতারণার শামিল।

অসুস্থ পশুকে সুস্থ দেখানো: দুর্বল পশুকে ওষুধ দিয়ে সাময়িক চাঙা করে বিক্রি করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। হাদিসে এসেছে, ‘চার ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি হবে না- অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রুগ্ন পশু যার রোগ সুস্পষ্ট, খোঁড়া পশু যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট এবং কৃশকায় দুর্বল পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে।’ (ইবনে মাজাহ: ৩১৪৪)

প্রতারণা হলেও কোরবানি কি শুদ্ধ হবে?

ফিকহবিদরা বলেন, ইনজেকশন বা ওষুধ দিয়ে মোটাতাজা করা পশু যদি কোরবানির উপযুক্ত বয়স পূর্ণ করে এবং শরিয়ত নির্ধারিত ত্রুটিমুক্ত হয়, তাহলে তা দিয়ে কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। কারণ মোটাতাজাকরণের জন্য ওষুধ প্রয়োগ কোরবানি অশুদ্ধ হওয়ার মৌলিক ত্রুটির অন্তর্ভুক্ত নয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৭০; ফতোয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত: ১১/২০৯)
তবে ফকিহরা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি উল্লেখ করেছেন- কোনো খাদ্যের কারণে যদি পশুর গোশতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে তা মাকরুহ বা নিষিদ্ধ হবে। আর ক্ষতিকর প্রভাব না থাকলে বৈধ থাকবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৫৪; রদ্দুল মুহতার: ৯/৪৯১; আল-মাবসুত: ১১/২৫৫)
প্রতারণামূলক পদ্ধতি অবলম্বনকারী গুনাহগার হবেন, এটি নিশ্চিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম: ১০২)

ক্রেতারা কীভাবে সতর্ক হবেন?

কিছু লক্ষণ দেখে সন্দেহজনক পশু চেনা যায়: শরীরে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে গর্ত হয়ে থাকা ও সহজে না ভরা; হাঁটতে কষ্ট হওয়া; চোখ লাল বা নিস্তেজ হওয়া; শরীরে পানি জমার লক্ষণ; মোটা হলেও দুর্বল আচরণ এবং দ্রুত হাঁপিয়ে যাওয়া। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ইসলামে ব্যবসায় সততা

ইসলামে ব্যবসায় সততাকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীরা কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি: ১২০৯)

কোরবানি তাকওয়া, সততা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দেয়। বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণ বৈধ হলেও ক্ষতিকর রাসায়নিক, স্টেরয়েড বা প্রতারণামূলক উপায়ে পশু মোটা করে বেশি দামে বিক্রি করা ইসলামি নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েরই উচিত সচেতন থাকা এবং সুস্থ, নিরাপদ ও শরিয়তসম্মত পশু নির্বাচন করা, কারণ কোরবানির প্রকৃত চেতনা হলো হালাল উপার্জন, সততা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।