জুমার পরের ১৫ মিনিট: আত্মশুদ্ধির এক নীরব অনুশীলন
ফাইল ফটো
একজন বিচক্ষণ ব্যবসায়ী প্রতি সপ্তাহে তার লাভ-ক্ষতির খাতা মেলান। কিন্তু মুমিনের জন্য আমলনামার হিসাব তার চেয়েও বেশি জরুরি; কারণ ব্যবসার ক্ষতি পোষানো যায়, আখেরাতের ক্ষতি পোষানোর সুযোগ নেই। ইসলামি পরিভাষায় এই আত্মিক হিসাব-নিকাশকে বলা হয় ‘মুহাসাবাতুন নাফস’- অর্থাৎ নিজের নফসের বিচার নিজেই করা। সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমায় এই অনুশীলনটি করা ধর্মীয়, মানসিক ও নৈতিক বিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
মুহাসাবাহ: ধারণা ও দলিল
‘মুহাসাবাহ’ শব্দটি আরবি ‘হিসাব’ ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ নিজের কাজ, নিয়ত ও আচরণকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা। আল্লাহ তাআলা সরাসরি এই আত্মপর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে, সে আগামীকালের (কেয়ামতের) জন্য কী পাঠিয়েছে।’ (সুরা হাশর: ১৮) তাফসিরবিদগণ বলেন, এই আয়াতে ‘লক্ষ্য করা’ মানে নিজের আমলের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও হিসাব; যা মুহাসাবাহর মূল ভিত্তি।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর দুর্বল সেই ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে বড় বড় প্রত্যাশা রাখে।’ (তিরমিজি: ২৪৫৯; হাদিসটি হাসান)
খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলতেন- ‘তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই তোমরা নিজেরাই নিজেদের হিসাব নাও এবং আমল ওজন করার আগেই তোমরা তা ওজন করো। কারণ আজ হিসাব নেওয়া আগামীকালের হিসাবকে হালকা করবে।’ (ইবনুল কাইয়িম, ‘ইগাসাতুল লাহফান’)
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে মুহাসাবাহকে আত্মশুদ্ধির অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, প্রতিদিন বা অন্তত প্রতি সপ্তাহে এই হিসাব করা উচিত।
কেন জুমার দিন সর্বোত্তম সময়?
জুমার দিন সপ্তাহের একটি প্রাকৃতিক ছেদবিন্দু। সাত দিনের আমলকে একটি একক হিসেবে মূল্যায়ন করার জন্য এটি আদর্শ সময়। জুমার খুতবা ও নামাজের পর অন্তর কোমল থাকে এবং নিজের দোষ স্বীকার করার মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়। এছাড়া আছর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়টি দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত হওয়ায় তওবা ও সংকল্পের জন্য এটি শ্রেষ্ঠ সুযোগ।
মুহাসাবাহর ব্যবহারিক পদ্ধতি
জুমার নামাজের পর অন্তত ১৫ মিনিট নির্জনে মোবাইল ও অন্যান্য বিভ্রান্তি থেকে সরে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে-
| সময় | করণীয় |
| ৫ মিনিট | গত সপ্তাহের আমল ও আচরণ স্মরণ করা |
| ৫ মিনিট | ভুল ও গুনাহ চিহ্নিত করা এবং তার কারণ ভাবা |
| ৩ মিনিট | আন্তরিক তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা |
| ২ মিনিট | আগামী সপ্তাহের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সংকল্প নেওয়া |
প্রথম ধাপ- নেয়ামতের স্বীকৃতি: গত সপ্তাহে আল্লাহ কী কী সুযোগ দিয়েছেন তা ভাবুন এবং শুকরিয়া জানান।
দ্বিতীয় ধাপ- ত্রুটি চিহ্নিতকরণ: নিজেকে প্রশ্ন করুন- কারো মনে কষ্ট দিয়েছি কি? নামাজে অবহেলা হয়েছে কি? মিথ্যা বলেছি কি? গিবত, ক্রোধ বা অহংকারে জড়িয়েছি কি? পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করেছি কি?
তৃতীয় ধাপ- একটি গুনাহ ত্যাগের সংকল্প: সব গুনাহ একসাথে ছাড়ার সংকল্প প্রায়ই ব্যর্থ হয়। বরং এই অডিটের মাধ্যমে চিহ্নিত করুন- ‘আগামী সাত দিন আমি অন্তত এই একটি নির্দিষ্ট গুনাহ (যেমন: গিবত করা বা অনর্থক স্ক্রিন টাইম) কোনোভাবেই করব না।’
আত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
আত্মিক দিক: নিয়মিত মুহাসাবাহ সচেতনতা বাড়ায়। যখন জানা থাকে জুমায় হিসাব দিতে হবে, তখন সারা সপ্তাহ কাজে সতর্কতা আসে। ছোট ছোট তওবার মাধ্যমে গুনাহের কালিমা আত্মায় স্থায়ী দাগ ফেলতে পারে না।
মনস্তাত্ত্বিক দিক: আধুনিক মনোবিজ্ঞান বিশেষত Cognitive Behavioral Therapy এবং Positive Psychology নিয়মিত আত্মপর্যালোচনাকে মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত পরিবর্তনের কার্যকর উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইসলাম চৌদ্দশো বছর আগে যে পদ্ধতির কথা বলেছে, আধুনিক গবেষণাও আজ তার কার্যকারিতাকে সমর্থন করছে।
অনেক সময় মানুষ পৃথিবীর সবার সামনে সফল হলেও নিজের আত্মার সামনে পরাজিত থাকে; মুহাসাবাহ সেই গোপন পরাজয়কে চিনে নেওয়ার নাম। জুমার দিন আত্মাকে ধুয়ে পরিষ্কার করার দিন। সপ্তাহে মাত্র ১৫ মিনিটের এই নির্জন আত্মিক বৈঠক হতে পারে একটি জীবন্ত আধ্যাত্মিক বিপ্লব। হাসান আল-বাসরি (রহ.) বলতেন- ‘যে ব্যক্তি নিজের হিসাব করে না, তার কোনো দ্বীন নেই।’ (ইমাম গাজ্জালি, ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’)। সপ্তাহে একবার নিজের আত্মার সামনে সৎভাবে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত সাহসিকতা এবং আত্মিক সাফল্যের অন্যতম শর্ত।