স্তন ক্যান্সারের লাখো রোগী এড়াতে পারবেন কেমোথেরাপি, বলছে গবেষণা
ছবি: সংগৃহীত
অদূর ভবিষ্যতে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত লাখো নারী নিরাপদে কেমোথেরাপি এড়াতে পারবেন; কারণ বিজ্ঞানীরা এমন একটি ডিএনএ পরীক্ষা উদ্ভাবন করেছেন যা নির্ধারণ করতে পারে যে কোন রোগীরা এই চিকিৎসা থেকে উপকৃত হবেন এবং কারা হবেন না। সাম্প্রতিক একটি গবেষণার ফলাফলে এমনটাই বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক এই গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষকে কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা করে শুধু হরমোন থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
যাদের স্কোর কম ছিল— অর্থাৎ যারা দলের সেই দুই-তৃতীয়াংশের অন্তর্ভুক্ত—তাদের কেমোথেরাপি দেওয়া হয়নি।
এই দলের পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৩.৭%, আর কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৪.৯%।
সাধারণভাবে স্তন ক্যানসারের প্রধান চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ। তারপর রোগটির ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে প্রায়ই কেমোথেরাপি পরামর্শ দেওয়া হয়।
কেমোথেরাপির কারণে ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, চুল পড়ে যাওয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া এবং প্রজনন সম্পর্কিত সমস্যা হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)–এর নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং থাইল্যান্ডের ৪ হাজারের বেশি নারী স্বেচ্ছাসেবক অংশ নিয়েছেন। তাদের সবার বয়স ৪০ বছরের বেশি বয়সী এবং সবাই নতুন শনাক্ত হওয়া স্তন ক্যানসার রোগী।
বিজ্ঞানীরা 'প্রোসিগনা' নামে একটি জিন পরীক্ষা ব্যবহার করেন, যা স্তন ক্যানসারের বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত ৫০টি জিনের কার্যক্রম পরিমাপ করে এবং রোগীর পুনরায় রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি নির্ধারণ করে।
প্রাথমিক স্তরের স্তন ক্যানসার যা কাছাকাছি লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়েছে, এমন রোগীদেরও নিয়মিত এই চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তবে চিকিৎসকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে যে স্তন ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরনটিতে এই চিকিৎসা খুব বেশি উপকার নাও দিতে পারে।
ইউসিএলের নতুন গবেষণার ফলে প্রতি বছর যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা দপ্তর ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া স্থন ক্যানসার রোগীদের মধ্যে ৫ হাজারেরও বেশি নারী কেমোথেরাপি এড়াতে পারবেন।
কার্ডিফের ক্যারেন বনহ্যাম এই গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনি বলেন, ফলাফলটি ‘অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক’ এবং ‘বড়দিনের মতো’ অনুভূতি তৈরি করেছে।
৬৪ বছর বয়সী এই নারী প্রোসিগনা পরীক্ষার কারণে কেমোথেরাপি এড়াতে পেরেছেন এবং তার পরিবর্তে আট বছর ধরে রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপি নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ক্যানসার শনাক্ত হওয়া এবং চিকিৎসা নেওয়া অনেকের জন্যই একটি ভীষণ রকমের ধাক্কা হতে পারে। এটি আপনাকে অনিশ্চয়তার এক জগতে ছুড়ে দেয়। জীবনের অগ্রাধিকার বদলে যায়, সবকিছুর পরিবর্তে তখন আপনি কেবল বাঁচতে চান।”
এ গবেষণার ফলাফল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসার সম্মেলন-আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
গবেষণা দলের প্রধান এবং ইউসিএল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের ব্রেস্ট অনকোলজির অধ্যাপক প্রফেসর রব স্টেইন বলেন, “এই ফলাফল রোগীদের আলাদা আলাদাভাবে আরো সঠিকভাবে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।”
“এ গবেষণায় কেবল প্রচলিত ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর না করে টিউমারের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রোগীদের জন্য এর অর্থ হলো, অনেকেই কেমোথেরাপির শারীরিক ও মানসিক চাপ এবং এর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা পাবেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এটি সম্পদের আরও দক্ষ এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।”
ইউসিএল জানিয়েছে, এই ফলাফল ৪০ বছরের কম বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা এখনও জানা যায়নি। আরও কয়েক বছর সময় লাগবে তা জানতে।