চরের মতো দখল হচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগর

চরের মতো দখল হচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগর

ছবিঃ সংগৃহীত।

দক্ষিণ চীন সাগরের প্রবালপ্রাচীর দখল নিয়ে চলছে শক্তির লড়াই। এই সামুদ্রিক অঞ্চলে একের পর এক গড়ে তোলা হচ্ছে কৃত্রিম দ্বীপ। যা দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জোরালো করছে বিভিন্ন দেশ।

চীনের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় এখন যোগ দিয়েছে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন। ফলে আলোচনার টেবিলের চেয়ে সমুদ্রের বুকে বালু ফেলে নতুন ভূমি তৈরির প্রতিযোগিতাই যেন হয়ে উঠেছে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রধান মাধ্যম।

এই বাস্তবতায় দক্ষিণ চীন সাগরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে একটি নতুন নীতি— যে যতটুকু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, সেটিই হবে তার শক্তির ভিত্তি।

দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত অ্যান্টিলোপ রিফ। এটি অশ্রুবিন্দু আকৃতির একটি প্রবালপ্রাচীর। যার বেশিরভাগ অংশই ডুবে থাকত পানির নিচে। কিন্তু চলতি বছর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে নাটকীয় রূপান্তর ঘটেছে প্রবালপ্রাচীরটির।

সমুদ্রতল থেকে লাখ লাখ টন বালি তুলে এনে সেখানে তৈরি করা হয়েছে নতুন ভূমি। আগে মানচিত্রে এটি ছিল কেবল ফিরোজা রঙের একটি ক্ষুদ্র বিন্দু। এখন সেই অ্যান্টিলোপ রিফ পরিণত হয়েছে প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উজ্জ্বল সাদা বালুর অর্ধচন্দ্রাকৃতি দ্বীপে। দ্বীপের এক কোণে এরইমধ্যে গড়ে উঠেছে কয়েকটি স্থাপনাও।

নতুন ভূমির ভেতরে তৈরি হওয়া অগভীর জলাশয়ে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য জাহাজ। এগুলোর বেশিরভাগই সম্ভবত কাটার সাকশন ড্রেজার। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় বহর রয়েছে চীনের হাতে। এসব ড্রেজারের কয়েকটি প্রতি ঘণ্টায় ৬ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত বালি তুলতে সক্ষম। যা প্রায় দুটি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুল পূরণের সমান।

এত দ্রুত গতিতে ভূমি পুনরুদ্ধারের এই কার্যক্রম সম্ভবত বিশ্বরেকর্ডের কাছাকাছি। তবে এমন কাজ শুধু চীনই করছে না।

দীর্ঘদিন ধরে চীনের আগ্রাসী ভূমি পুনর্গঠন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পর এখন ভিয়েতনামও দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রবালপ্রাচীরগুলো সম্প্রসারণ শুরু করেছে। তুলনামূলক কম পরিসরে হলেও ফিলিপাইনসহ অন্য দাবিদার দেশও একই পথে হাঁটছে।

ড্রেজিং যুদ্ধের নতুন অধ্যায়

অ্যান্টিলোপ রিফ অবস্থিত প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জে। প্যারাসেল ও স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইর মধ্যে বিরোধপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত।

এই দ্বীপগুলোর বেশিরভাগই আগে ছিল ডুবে থাকা প্রবালপ্রাচীর। যেখানে ছিল না কোনো স্থায়ী মানববসতি। ১৯৭৪ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নেয় চীন।

পরবর্তী সময়ে চীন স্প্র্যাটলি অঞ্চলের মিসচিফ, ফায়ারি ক্রস ও সুবি রিফে ব্যাপক ভূমি পুনর্গঠন করে সেগুলোকে বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের উপযোগী কৃত্রিম দ্বীপে রূপান্তর করে। একই সঙ্গে ‘নাইন-ড্যাশ লাইনের’ ভিত্তিতে প্রায় পুরো দক্ষিণ চীন সাগরকেই নিজেদের সার্বভৌম এলাকা হিসেবে দাবি করতে শুরু করে।

বর্তমানে চীনের কোস্টগার্ড ও সামুদ্রিক মিলিশিয়ার অসংখ্য জাহাজ এই অঞ্চলে নিয়মিত টহল দেয়। এটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে অন্যান্য দাবিদার দেশগুলোর জন্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিপাইনের কোস্টগার্ডের সঙ্গে ঘটেছে একাধিক সংঘর্ষও।

অ্যান্টিলোপ রিফের নবনির্মিত সৈকতের একটি অংশের সোজাসুজি নকশা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে নতুন সামরিক মানের রানওয়ে নির্মাণ করতে পারে চীন। তবে কাছেই উডি আইল্যান্ডে একটি কার্যকর বিমানঘাঁটি রয়েছে তাদের। ফলে প্রশ্ন উঠেছে নতুন রানওয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য সামরিক প্রয়োজনের চেয়ে ভিয়েতনামকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।

ভিয়েতনামের পাল্টা কৌশল

দক্ষিণ চীন সাগর ভিয়েতনামে পূর্ব সাগর নামে পরিচিত। এটি নিয়ে দুই দেশের বিরোধ দীর্ঘদিনের।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশ্যে চীনবিরোধী বক্তব্য কমিয়েছে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব। তারা মনোযোগ দিয়েছে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে।

এ বছর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব তো লাম তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যান। ওই সফরে দুই দেশই প্যারাসেল ও স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টি তুলনামূলক নমনীয় ভাষায় উল্লেখ করে।

অ্যান্টিলোপ রিফে চীনের নির্মাণকাজের বিরুদ্ধে ভিয়েতনাম আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে, তবে তা ছিল কূটনৈতিক ও সংযত ভাষায়।

অন্যদিকে বাস্তবে ভিয়েতনামও একই ধরনের শক্তিশালী ড্রেজার ব্যবহার করে সম্প্রসারণ করছে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রবালপ্রাচীরগুলো।

গত তিন বছরে অন্তত ২০টি রিফে বালি ফেলে ভূমি পুনর্গঠন করেছে দেশটি। ওয়াশিংটনভিত্তিক এশিয়ান মেরিটাইম ট্রান্সপারেন্সি ইনিশিয়েটিভের (এএমটিআই) তথ্য অনুযায়ী, ১১টি নতুন বন্দরও নির্মাণ করেছে তারা।

বর্তমানে ভিয়েতনামের নিয়ন্ত্রণে থাকা পুনরুদ্ধারকৃত ভূমির পরিমাণ ১১ বর্গকিলোমিটারের বেশি। যা চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন পুনর্গঠিত এলাকার প্রায় অর্ধেক।

এখন নেভিগেশন বীকনের মতো সামরিক অবকাঠামোও নির্মাণ শুরু করেছে দেশটি। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভিয়েতনামের কৌশল হলো, ‘চীনকে হারানো না গেলে তার কৌশলই অনুসরণ করা।’

এএমটিআইয়ের পরিচালক গ্রেগ পোলিং বলেছেন, ‘ভিয়েতনাম চীনের সঙ্গে বিরোধের প্রচারযুদ্ধে সামনে থাকতে চায়নি। তারা বরং সেই ভূমিকা নিতে দিয়েছে ফিলিপাইনকে। কিন্তু বাস্তবে সমুদ্রে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে অনেক বেশি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে তারা।

চীনের বার্তা

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা সিলাইটের পরিচালক রে পাওয়েলের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে চীনের মূল মনোযোগ ছিল ফিলিপাইনের দিকে। এই সুযোগে দ্রুত ভূমি পুনর্গঠন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছে ভিয়েতনাম।

তার ভাষায়, অ্যান্টিলোপ রিফে চীনের নতুন প্রকল্পকে ভিয়েতনামের জন্য একটি বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। যার অর্থ হলো, ‘এই এলাকায় সবচেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড় এখনও চীনই।’

কূটনৈতিক অচলাবস্থা

গত তিন দশক ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ান দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীন ও সংশ্লিষ্ট সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) তৈরির চেষ্টা করছে।

২০০২ সালে একটি তুলনামূলক দুর্বল ঘোষণা গৃহীত হলেও সেটি বাধ্যতামূলক ছিল না এবং তা প্রায় উপেক্ষাই করেছে চীন।

প্রতিবছর আসিয়ান সম্মেলনে কার্যকর আচরণবিধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালে ফিলিপাইন বিষয়টি নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিশি আদালতে নিয়ে যায়।

আদালত ফিলিপাইনের পক্ষে রায় দিয়ে জানায়, ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ বা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ঐতিহাসিক মালিকানা দাবির একটি কাল্পনিক সীমানা। এর ভিত্তিতে চীনের সার্বভৌমত্ব দাবি ঐতিহাসিকভাবে বৈধ নয়। একই সঙ্গে প্রবালপ্রাচীরকে কৃত্রিম দ্বীপে রূপান্তরসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। ক্ষুণ্ন করেছে ফিলিপাইনের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের অধিকার।

কিন্তু সেই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে চীন।

এরপর ফিলিপাইন তুলনামূলক দুর্বল নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড নিয়ে চীনের উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণের কৌশল গ্রহণ করে। এতে একাধিক সংঘর্ষ ঘটলেও শক্তির ভারসাম্যে তেমন পরিবর্তন আসেনি।

একই সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করেছে ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ৫০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তাসহ দিয়েছে নতুন সামরিক সরঞ্জাম।

এ ছাড়া নিয়মিত ‘ফ্রিডম অব ন্যাভিগেশন অপারেশনের’ মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ টহল পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। যাতে বোঝানো যায় যে এসব জলপথ এখনও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ হিসেবেই স্বীকৃত। তবে এসব অভিযান মূলত প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।

এদিকে এখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন অবস্থানগুলো শক্তিশালী করছে ফিলিপাইনও। পাগাসা বা থিতু দ্বীপের রানওয়ে সম্প্রসারণ, কোস্টগার্ড ঘাঁটি স্থাপনসহ শক্তিশালী করার কাজ চলছে সেকেন্ড থমাস শোলে অবস্থানরত বিএআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজকে।

নতুন বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বাধ্যতামূলক আচরণবিধি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

গ্রেগ পোলিংয়ের মতে, ‘চীন সমুদ্রে যা খুশি তাই করে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে ক্ষয় করছে অন্যদের সার্বভৌম অধিকার। ফলে শেষ পর্যন্ত হয়তো একটি বাধ্যতামূলক নয়, এমন সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।’

তার মতে, সেই পরিস্থিতিতে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ আসিয়ানের বাইরে নিজেদের মধ্যে আরও কার্যকর আলোচনার পথ খুঁজতে পারে।

দক্ষিণ চীন সাগরের বর্তমান বাস্তবতা যেন এখন একটাই বার্তা দিচ্ছে। প্রত্যেক দেশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল রক্ষায় ব্যস্ত, আর সবাই মেনে নিচ্ছে যে এই অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে আগ্রাসী শক্তি এখনও চীন।