দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাবেন যেভাবে

দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাবেন যেভাবে

ফাইল ফটো

এক গ্লাস পানি খাচ্ছেন, আর তার সাথে গিলে ফেলছেন অসংখ্য অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই এখনকার বাস্তব। সকালে ঘুম থেকে উঠে যে ব্রাশ হাতে নিচ্ছেন, সেখান থেকে শুরু করে রাতের খাবারের প্লেট পর্যন্ত আমাদের পুরো জীবনটাই যেন প্লাস্টিকের মোড়কে বন্দি। 

সস্তা আর সুবিধাজনক হওয়ায় এটি আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর জন্য নীরবে চরম মূল্য চোকাচ্ছে আমাদের শরীর আর পরিবেশ। এই দূষণের মাত্রা নিয়ে ভাবলে অনেকেই হয়তো দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, কোথা থেকে শুরু করবেন তা ভেবে পান না। 

তবে ভালো খবর হলো, রাতারাতি সব বদলানোর দরকার নেই। দৈনন্দিন অভ্যাসে খুব ছোট আর সাধারণ কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমেই আমরা এই বিপদ থেকে নিজেদের অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পারি।

রান্নাঘর থেকে শুরু হোক পরিবর্তন

আমাদের শরীরে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক প্রবেশ করে খাবারের মাধ্যমে। তাই রান্নাঘর থেকেই পরিবর্তন শুরু করা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ননস্টিক বা টেফলন প্যানের বদলে কাস্ট আয়রন, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করতে পারেন। 

ননস্টিক প্যানে আঁচড় লাগলে বা অতিরিক্ত গরম হলে তা খাবারে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়াতে পারে। রান্নার জন্য প্লাস্টিকের চামচের বদলে কাঠ বা স্টিলের চামচ বেছে নিন। খাবার সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিকের বক্সের বদলে কাঁচের জার বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করুন। 

কেনাকাটা ও খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা

দোকানে যাওয়ার সময় সাথে করে কাপড়ের বা পাটের তৈরি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস করুন। যেসব পণ্য কাঁচের পাত্রে বিক্রি হয়, সেগুলো কেনার চেষ্টা করুন। ফ্রোজেন বা হিমায়িত খাবারে প্রচুর প্লাস্টিকের মোড়ক থাকে, তাই তাজা খাবার খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। 

চা বা কফি খাওয়ার ক্ষেত্রে ওয়ান-টাইম কাপ বা প্লাস্টিকের টি-ব্যাগের বদলে সাধারণ চায়ের পাতা এবং নিজের কাঁচ বা স্টিলের ফ্লাস্ক ব্যবহার করা অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।

ঘরের পরিবেশ ও অন্যান্য অভ্যাস

আমাদের পরনের পলিয়েস্টার বা নাইলনের মতো সিন্থেটিক পোশাক ধোয়ার সময় প্রচুর মাইক্রোফাইবার বাতাসে ও পানিতে মিশে যায়। তাই সুতি, লিনেন বা উলের মতো প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক পরার চেষ্টা করুন। ঘর পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত ভ্যাকুয়াম করুন, যাতে ধুলোয় মিশে থাকা প্লাস্টিক কণা দূর হয়। 

শেভ করার জন্য প্লাস্টিকের ডিসপোজেবল রেজারের বদলে ব্লেড বদলানো যায় এমন ধাতব রেজার ব্যবহার করতে পারেন। ঘর সাজানো বা যেকোনো অনুষ্ঠানে প্লাস্টিকের বেলুনের বদলে তাজা ফুল বা কাগজের তৈরি জিনিস ব্যবহার করা পরিবেশের জন্য দারুণ একটি পদক্ষেপ।

সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ

বর্তমান পৃথিবীতে প্লাস্টিককে আমাদের জীবন থেকে রাতারাতি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়। এখানে নিখুঁত হওয়ার চেয়ে বরং চেষ্টা শুরু করাটাই বেশি জরুরি। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, প্রতিদিনের ছোট ছোট বদলেই লুকিয়ে আছে বড় পরিবর্তন। 

যেমন ধরুন, হয়তো আজ থেকে চুইংগাম চিবানোর অভ্যাসটা ছেড়ে দিলেন, কারণ এতেও কিন্তু সিন্থেটিক রাবার বা লুক্কায়িত প্লাস্টিক থাকে! আপনার এই সাধারণ ও সচেতন পদক্ষেপগুলোই প্রতিদিন শরীরে প্রবেশ করা ক্ষতিকর প্লাস্টিকের পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে দেবে।

পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহার করে, ক্রেতা হিসেবে তাদের উৎসাহ দিন এবং নিজের এই নতুন অভ্যাসগুলোর কথা পরিবার ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। মনে রাখবেন, আপনার প্রতিদিনের প্রতিটি ছোট উদ্যোগই দিন শেষে একটি বড় প্রভাব ফেলবে। 

নিজের এবং প্রিয়জনদের সুস্থতার জন্য, আর বাসযোগ্য সুন্দর একটি পৃথিবীর স্বার্থে আজ থেকেই শুরু হোক আপনার এই নতুন যাত্রা। সবার সম্মিলিত চেষ্টাতেই কেবল একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।