প্রতিবেশীর যে খবর আপনাকে অবশ্যই রাখতে হবে
ছবি: সংগৃহীত
আধুনিক যান্ত্রিক নগরজীবনে আমরা পাশের ফ্ল্যাটে বা পাশের বাড়িতে কে থাকছে, তার খবর রাখা তো দূরে থাক, পরিচয়টুকুও জরুরি মনে করি না। চারদিকে দেয়াল তুলে আমরা নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি। একই এলাকায় বছরের পর বছর বসবাস করলেও অনেক প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের সামান্য কুশল বিনিময়ও হয় না। অথচ ইসলামি সমাজব্যবস্থায় প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা এবং তাদের খোঁজখবর রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ও হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন যে, আমি ধারণা করলাম, হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৪)
প্রতিবেশীর গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন- ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতা, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন, নিকটবর্তী প্রতিবেশী, দূরবর্তী প্রতিবেশী, সঙ্গী, মুসাফির এবং তোমাদের অধীনস্থদের সঙ্গে।’ (সুরা নিসা: ৩৬)
প্রতিবেশীর কোন খবরগুলো আপনার রাখা জরুরি এবং কেন, সে বিষয়ে ইসলামের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো-
প্রতিবেশী কি আপনার কাছে নিরাপদ?
প্রতিবেশীর খবর রাখার প্রথম শর্ত হলো- আপনার কথা বা কাজের মাধ্যমে সে কষ্ট পাচ্ছে কি না, সেই খবর রাখা। রাসুলুল্লাহ (স.) তিনবার শপথ করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৬) ফকিহগণের মতে, এখানে ‘অনিষ্ট’ বলতে শুধু শারীরিক আঘাত নয়, বরং উচ্চস্বরে শব্দ করা, আবর্জনা ফেলা কিংবা প্রতিবেশী মানসিক চাপে থাকে এমন সব কাজই অন্তর্ভুক্ত।
পাশে কেউ ক্ষুধার্ত নেই তো?
আপনার ঘরে খাবারের প্রাচুর্য থাকবে আর পাশের ঘরের মানুষ না খেয়ে দিন কাটাবে- ইসলামে এটি অগ্রহণযোগ্য। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে নিজে পেটভরে খায় অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ: ১১১) আপনার খাবারের সামান্য অংশ দিয়ে হলেও প্রতিবেশীর মৌলিক এই খবর রাখা ঈমানের দাবি।
‘বদ্ধ দুয়ার’ ও সদাচারের অভাব
অনেকে প্রতিবেশীর সাথে সরাসরি ঝগড়া করেন না ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রয়োজনে নিজের দরজা বন্ধ করে রাখেন। আল-আদাবুল মুফরাদের একটি বর্ণনায় এসেছে, অনেক প্রতিবেশী কেয়ামতের দিন তার প্রতিবেশীকে অভিযুক্ত করে আল্লাহর কাছে বলবে- ‘হে প্রভু! এই ব্যক্তি আমার জন্য তার দ্বার রুদ্ধ করে রেখেছিল এবং আমাকে তার সদাচার থেকে বঞ্চিত করেছে।’ (আল আদাবুল মুফরাদ: ১১০) অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশীকে সাহায্য না করা কেয়ামতের দিন জবাবদিহিতার কারণ হবে।
আমল যখন বিফলে যায়
প্রতিবেশীর সাথে আচরণের প্রভাব এতটাই বেশি যে, আপনার পাহাড়সম ইবাদতও বিফলে যেতে পারে। একবার রাসুলুল্লাহ (স.)-কে এক নারীর কথা বলা হলো যে অনেক নামাজ-রোজা ও দান-সদকা করে, কিন্তু জবান দিয়ে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। নবীজি (স.) সংক্ষেপে বললেন, ‘সে জাহান্নামি।’ আর যে নারী অল্প নফল ইবাদত করেও প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না, তাকে নবীজি (স.) ‘জান্নাতি’ ঘোষণা করেছেন। (মুসনাদে আহমদ ও আল-আদাবুল মুফরাদ)
প্রতিবেশীর সম্মান ও মর্যাদা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিবেশীর সম্মান ও আমানত রক্ষা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নবীজি (স.) বলেছেন, প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করার অপরাধ অন্য ১০ জন সাধারণ নারীর সাথে ব্যভিচার করার চেয়েও জঘন্য। (মুসনাদে আহমদ: ২৩৩৪২) অর্থাৎ প্রতিবেশী আপনার ওপর যে আমানত ও মর্যাদা রক্ষা করার বিশ্বাস রাখে, তার অমর্যাদা করা ইসলামে চরমতম অপরাধ।
ছোটখাটো প্রয়োজনে পাশে থাকা
ইসলাম কেবল বড় বিপদে নয়, ক্ষুদ্র প্রয়োজনেও প্রতিবেশীর প্রতি খেয়াল রাখতে বলে। হজরত আবু জার (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (স.) উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘তুমি যখন ঝোল (তরকারি) রান্না করবে, তখন তাতে একটু বেশি পানি দেবে এবং তোমার প্রতিবেশীদের কথা বিবেচনা করবে।’ (সহিহ মুসলিম) এই হাদিসে মূলত প্রতিবেশীর সঙ্গে সামান্য খাবার ভাগাভাগি করার মাধ্যমে আন্তরিকতা তৈরির শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
অসুস্থতা ও বিপদের খবর
প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া এবং তার চিকিৎসায় সহায়তা করা ভ্রাতৃত্বের দাবি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের যে ছয়টি হক রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো- সে অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। (সহিহ মুসলিম: ২১৬২) প্রতিবেশী হিসেবে এই দায়িত্বের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা
প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কৌতূহল দেখানো বা তার গোপন বিষয় অনুসন্ধান করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।’ (সুরা হুজরাত: ১২) প্রতিবেশীর খবর রাখা মানে তাকে সাহায্য করা, তার ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানো নয়।
নাগরিক জীবনে আমাদের করণীয়
- অন্তত সপ্তাহে একদিন বা ছুটির দিনে প্রতিবেশীর কুশল বিনিময় করুন
- কোনো বিশেষ রান্না বা উৎসবের খাবার সামান্য হলেও প্রতিবেশীকে দিন
- অসুস্থতা বা পারিবারিক কোনো সংকটে প্রতিবেশীকে সাহায্যের প্রস্তাব দিন
-
প্রতিবেশী আমাদের সামাজিক অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরকালে প্রতিবেশীর অধিকার নিয়ে প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তাই নিজের ঈমানকে পরিপূর্ণ করতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের প্রত্যাশায় আজই আপনার প্রতিবেশীর খোঁজ নিন। মনে রাখা দরকার, কেয়ামতের দিন আমাদের চরিত্রের সাক্ষ্য শুধু পরিবার বা বন্ধু নয়, প্রতিবেশীরাও দেবে।