‘শান্তির দূত’ হয়ে হাইতিতে গিয়ে যখন গৃহযুদ্ধ থামিয়েছিল ব্রাজিল
ফাইল ফটো
ফুটবলকে বৈশ্বিক ঐক্যের অন্যতম প্রতীক বলে বিবেচনা করা হয়। যেখানে দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি ও যেকোনো ধরনের মতবাদ ছাপিয়ে মানুষ মিলিত হয় একই আবেগের বন্ধনে। এর শক্তি ঠিক কতটুকু? পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত দেশেও কি ফুটবল ঐক্য ফেরাতে পারে? উত্তরটি হচ্ছে– হ্যাঁ। যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার এমন বেশকিছু নজির আছে ফুটবলের।
আগামীকাল (শনিবার) ভোরে ২০২৬ বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচে ফিলাডেলফিয়ায় ব্রাজিল ও হাইতি মুখোমুখি হবে। এই ম্যাচের আগে সামনে এসেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ‘শান্তির দূত’ হয়ে ওঠার একটি ঘটনা। ২০০২ বিশ্বকাপে পঞ্চমবার বিশ্বসেরা হওয়ার ঠিক দুই বছর পর (২০০৪) তারা হাইতির গৃহযুদ্ধ থামাতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।
সেদিনের কথা হাইতির মানুষ এখনও ভুলে যায়নি, ২২ বছর আগে ব্রাজিল কীভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তখন ক্ষমতার জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে অস্থির এক কঠিন সময় পার করছিল দেশটি। ওই সময় ব্রাজিল জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল হাইতিতে। তারই অংশ হিসেবেই ২০০২ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটিকে হাইতিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
ফলে ২০০৪ সালের ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচটি পরিচিতি পায় ‘শান্তির ম্যাচ’ নামে। যা এখনও হাইতির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যে লক্ষ্য নিয়ে ম্যাচটির আয়োজন তা পুরোপুরি কাজে লেগেছে। কিছুটা হলেও স্বস্তি ও আনন্দের হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল সেই ম্যাচ, এর আগপর্যন্ত সেখানকার বাতাসে বারুদ আর লাশের গন্ধ মিলেমিশে একাকার হচ্ছিল।
হাইতির সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে সাবেক ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার রজার ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার মনে আছে, রোনালদো বলেছিল– বিশ্বকাপ জয়ের পর ব্রাজিলে উদযাপনের সময় তারা যে ভালোবাসা পেয়েছিল, হাইতির মানুষের কাছ থেকে এরচেয়েও বেশি আন্তরিকতা পায়। এসব মানুষ অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছে, কিন্তু ব্রাজিল দলের পাশে থাকতে পেরে তারা ভাসছিল অসাধারণ আনন্দে।’
স্মৃতি হাতড়ে ব্রাজিলের আরেক মিডফিল্ডার এদু গাসপার বলেন, ‘স্টেডিয়াম পুরোপুরি ভর্তি ছিল। আমি ভেবেছিলাম তারা শুধু রোনালদো, রোনালদিনহো, রবার্তো কার্লোস এবং বড় তারকাদেরই চিনবে। কিন্তু তারা ব্রাজিল দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছিল। তারা আমাদের সবাইকে চিনত। আমাদের প্রতিটি গোল তারা উদযাপন করেছিল।’
সেই ম্যাচে ব্রাজিল স্বাগতিক হাইতির প্রতিপক্ষ হিসেবে নামলেও নিজেদের জালে গোল হতে দেখে উদযাপনে কার্পণ্য করেননি দেশটির ফুটবলভক্তরা। ম্যাচের ফল– ব্রাজিলের ৬-০ গোলের উড়িয়ে দিলো হাইতিকে। যা সেদিনের আবেগের তুলনায় ছিল গৌণ। কারণ হাইতির সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, টেলিভিশনে দেখা বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের নিজেদের চোখের সামনে দেখা।
হাইতি সফরে ব্রাজিল দলের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্যগুলোর একটি ছিল বিমানবন্দর থেকে রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সের মূলকেন্দ্র পর্যন্ত যাত্রা। ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ নিজস্ব সেনাবাহিনীর উরুতু সাঁজোয়া যানগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে অতিক্রম করেন। আর রাস্তায় আনুমানিক ১০ লাখ হাইতিয়ান মানুষ তাদের স্বাগত জানিয়েছিল।
এদু স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমাদের কয়েকবার গাড়ি থামাতে হয়েছিল, কারণ মানুষ আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। তারা কাছে আসতে চেয়েছিল, আমাদের হাত ছুঁতে চেয়েছিল।’ এরপর অনুষ্ঠিত ম্যাচে ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী দলের সাতজন খেলোয়াড় অংশ নিয়েছিলেন। তারা হলেন– জুলিয়ানো বেলেত্তি, হুয়ান, রোক জুনিয়র, রবার্তো কার্লোস, জিলবার্তো সিলভা, রোনালদিনহো এবং রোনালদো। আর হাইতির উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড় ছিলেন ডিফেন্ডার পিয়েরে রিচার্ড ব্রুনি। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৯৫ ম্যাচ খেলা এই তারকা হাইতিকে ২০০৭ সালের ক্যারিবিয়ান কাপ জিততে ভূমিকা রাখেন।
ব্রাজিলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সফরে গিয়েছিলেন। তিনি খেলোয়াড়দের কূটনীতিক মনোভাব বজায় রেখে স্বাগতিকদের ওপর অতিরিক্ত বড় ব্যবধানের পরাজয় চাপিয়ে না দিতে বলেছিলেন। তবে সেই অনুরোধ সত্ত্বেও ব্রাজিল ৬টি গোল করে। রোনালদিনহো হ্যাটট্রিক এবং রজার দুই ও নিলমার একটি গোল করেন।
রজার বলেন, ‘এটি ছিল অসাধারণ একটি আয়োজন। মাঠে তারা যা দেখতে চেয়েছিল, আমরা সেটাই দিয়েছিলাম। আমরা একটি প্রদর্শনী উপহার দিয়েছি।’ ম্যাচটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল হাইতির মানুষের মধ্যে অস্ত্র সমর্পণ ও নিরস্ত্রীকরণে উৎসাহ তৈরি করা। তাই সাধারণভাবে টিকিট বিক্রি করা হয়নি। কিছু টিকিট অস্ত্র জমা দেওয়ার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সমর্থকরা বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের খেলা দেখার পাশাপাশি শান্তির উদ্যোগেও অংশ নিতে পারেন।
এই ম্যাচের মানবিক প্রভাবের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (সিবিএফ) ফিফা ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। পরে সেই পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠানে রোনালদিনহো নির্বাচিত হয়েছিলেন ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার।