আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল মেডিকেল শিক্ষায় মহাঅশনি সংকেত: বিএমডিসি

আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল মেডিকেল শিক্ষায় মহাঅশনি সংকেত: বিএমডিসি

ফাইল ছবি

রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে আবেগপ্রসূত ও জনতুষ্টিমূলক আখ্যা দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম। তাঁর মতে, ছয় শিশু মৃত্যুর ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ না হওয়া সত্ত্বেও একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিএমডিসির বিদ্যমান আইনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী যেখানে পড়বেন, সেখানই ইন্টার্নশিপ শেষ করবেন। সুতরাং আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল সংক্রান্ত বিষয়টি সুরাহায় সরকারকে দ্রুত মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

সোমবার (২২ জুন) রাতে এসব কথা জানান বিএমডিসি সভাপতি ও প্রখ্যাত শিশু সার্জন অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম।

বিএমডিসি সভাপতি বলেন, লাইসেন্স বাতিল করার সময় আদ-দ্বীন হাসপাতাল যে একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারের এ ব্যাপারে সতর্কতা বা সচেতনা থাকা দরকার ছিল। এটি একটি সাধারণ হাসপাতাল নয়, বরং একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এটা বড় সেবার অংশ। সরকার যদি আবেগপ্রসূত কাজ করে ... যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়গুলো আসছে, তাহলে তা মেডিকেল শিক্ষার জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনবে।

তাঁর প্রশ্ন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজে যেভাবে সেবা দেওয়া হয়, ওই পরিবেশকে কি কেউ কোনো মৃত্যুর কারণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না? জবাব হলো, পারে। মাঝে মাঝে হচ্ছেও। তাহলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ সরকারি প্রতিষ্ঠান বলে মাফ পেয়ে যাবে, আর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ধরা পড়ে যাবে?’

অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি মডেল। সরকার চাইলে সারাদেশে এ রকম একশ’ হাসপাতাল চালু করতে পারতো। যেখানে সেবার মান ও খরচ সাধারণ মানুষের আয়ত্ত্বের মধ্যে আনতে পেরেছে তারা। সরকার যদি এ রকম অনেক প্রতিষ্ঠান করতো, তাহলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ অনেক কমিয়ে আনা যেত। অথচ একটি ঠুনকো অজুহাতে সেটা বন্ধ করে দেওয়া হলো। ঠুনকো এজন্য বলছি, আদ্-দ্বীনে শিশু মৃত্যুর কারণ কিন্তু আমরা কেউ বের করতে পারিনি। এই অবস্থা কিন্তু আমাদের জন্য আবার একটি মৃত্যুকূপ অদৃশ্য করে রাখল। এ ব্যাপারে সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর—এ রকম জনতুষ্টিমূলক, জনগণকে দেখানো আচরণ করলে হবে না।’

তিনি বলেন, ‘একটি কথা কেউ উচ্চারণ করছে না, এটা রোগীর নিরাপত্তার ইস্যু। এটা অবহেলা না। কারণ আমাদের পরিবেশে এমন কিছু লুকিয়ে থাকে, যেটা হঠাৎ অদৃশ্য থেকে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। আদ্-দ্বীনের ঘটনা ইচ্ছা করে কেউ করেনি। এটা মোটেও এমন না যে, রোগীকে সুবিধা কম দিয়ে আদ্-দ্বীন বেশি মুনাফা করতে যাচ্ছিল। সেখানে সকল ব্যবস্থাই সচল ছিল। যদি এসি বন্ধ করাই কারণ হয়ে থাকে, তাহলে এটা নিশ্চিতই একজন নার্সের সচেতনতার অভাব হয়েছে এবং মধ্যরাতে উনি রোগীর স্বার্থেই করেছিলেন। রোগীদের অনুরোধেই করেছিলেন।’

‘তাহলে আদ্-দ্বীনে ছয় শিশু মৃত্যুর ঘটনায় বিচার্য বিষয় কিন্তু অনেক। শুধু এটাকে অবহেলার গণ্ডিভুক্ত করে ফেললে হবে না’—যোগ করেন তিনি।

লাইসেন্স বাতিলের ঘটনা দেশের স্বাস্থ্যশিক্ষার জন্য অশনি আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই লাইসেন্স বাতিল দেশের মেডিকেল এডুকেশনের ক্ষতি ডেকে আনবে। আপনারা জেনে থাকবেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের যে নির্ধারিত আসন ছিল, তা ইতিমধ্যে অর্ধেকে নেমে এসেছে। এটা আমাদের মেডিকেল শিক্ষায় মহাঅশনি সংকেত। বিদেশি শিক্ষার্থীরা কিন্তু ভারতেও সুবিধাবঞ্চিত তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। তারা শিক্ষায় কোনো সুযোগ পায় না। তারা ওখানে ভর্তি হতে পারে না বিপুল শিক্ষার্থীর জন্য। সেখানে থেকে আসে। তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটা অবদান রাখছিল। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠতে সাহায্য করছিল। আমাদের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানসিকতা গঠনে সাহায্য করছিল; আমরা যাকে বলি, ক্রস কালচারাল ডেভেলপমেন্ট। কাশ্মীরি একজন শিক্ষার্থী এলে আমার দেশের অনেকে আদব-কায়দাও শিখতে পারতো। এগুলো শিক্ষার একটা অংশ।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) বিদ্যমান আইন কি বলে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে একটি হাসপাতালের। কিন্তু এই হাসপাতাল শুধু সেবা দেয় না, এই হাসপাতাল শিক্ষাও দেয়। এটা বন্ধ করে পরিস্থিতি আরও জটিল করা হলো। একটা সাধারণ সমস্যাকে জটিল সমস্যায় রূপ দেওয়া হলো। আমাদের নীতিতে আছে, যে যেখানে পড়বে, সেখান থেকেই ইন্টার্নশিপ শেষ করবে। এমনকি শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ দেশেও একই চাহিদা যে, যেখান থেকে পড়বে, সে সেখান থেকেই ইন্টার্নশিপ করবে। সুতরাং সরকারকেই এখনই সুরাহায় যেতে হবে। তাহলে সমস্যার সমাধান হবে। না হলে সমস্যা আরও জটিল হবে।’

প্রসঙ্গত, গত ২৭ মে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। পরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল করে সরকার।