যে ১০ কারণে এবার বিশ্বকাপ জিততে পারেন রোনালদো

যে ১০ কারণে এবার বিশ্বকাপ জিততে পারেন রোনালদো

সংগৃহীত ছবি

টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক এক দিন আগে বেশ দেরিতে বিশ্বকাপের বিমান ধরেছিল পর্তুগাল। বক্সে সব টিক মার্ক দিয়েই হয়তো লিসবন ছেড়েছিল রবার্তো মার্তিনেজের দল। বিশ্বমঞ্চে এবার ‘হেভিওয়েট’ তকমা নিয়ে হাজির হওয়া পর্তুগাল গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ ড্র করলেও দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। ৪১ বছর বয়সে এসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পাশে পাচ্ছেন এমন একঝাঁক তরুণ ও চটপটে ফুটবলার, যা তাঁর ক্যারিয়ারে আগে কখনো ঘটেনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, পর্তুগিজদের প্রথমবার বিশ্বজয়ের স্বপ্নটা যে মোটেও অযৌক্তিক নয়, তা আজ উজবেক বধের রাতে মাঠের পারফরম্যান্স এবং নিচের ১০টি সুনির্দিষ্ট কারণেই স্পষ্ট।

১. দারুণ ফুলব্যাক জুটি

পর্তুগালের রক্ষণের দুই পাশ আগলে রাখার দায়িত্বে থাকা নুনো মেন্দেস ও জোয়াও ক্যানসেলো আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ফুলব্যাক জুটি। রক্ষণ সামলে বল পায়ে গতি বাড়িয়ে ওপরে ওঠা কিংবা প্রতিপক্ষের উইং ভেঙে ঢুকে পড়ায় তাঁদের জুড়ি মেলা ভার। আজকের ম্যাচেও ক্যানসেলোর চমৎকার অ্যাসিস্ট থেকেই আসে রোনালদোর প্রথম গোলটি। ব্যাকআপ হিসেবে ডিলোগো দালোত ও নেলসন সেমেদো থাকায় দুই প্রান্ত থেকে পর্তুগালের মুহুর্মুহু আক্রমণ পুরো বিশ্বকাপেই দেখা যাবে।

২. উইংয়ে ছড়ানো রোমাঞ্চের বারুদ

উইং দিয়ে আক্রমণের ঝড় তুলতে প্রস্তুত পেদ্রো নেতো, রাফায়েল লিয়াও, ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও, জোয়াও ফেলিক্স ও ফ্রান্সিসকো ত্রিনকাওদের নিয়ে গড়া ফুটবল-দুনিয়ার অন্যতম রোমাঞ্চকর উইং আক্রমণভাগ। প্রত্যেকেই ক্লাব ফুটবলের প্রধান তারকা। আজকের ম্যাচেও বদলি হিসেবে নেমে ৮৭ মিনিটে দলের পঞ্চম গোলটি করে উজবেকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন উইঙ্গার রাফায়েল লিয়াও।

৩. প্যারিসের রসায়ন বা ‘পিএসজি কানেকশন’

বিশ্বকাপ জেতার অঙ্কে কৌশলের পাশাপাশি দরকার চমৎকার বোঝাপড়া, যা ২০১০ সালের স্পেন বা ২০১৪ সালের জার্মানি দলে দেখা গিয়েছিল। এবার সেই চেনা সুরটাই মার্তিনেজ খুঁজে পাচ্ছেন 'পিএসজি কানেকশনে'। ফরাসি ক্লাব পিএসজির জার্সিতে একসঙ্গে মাঠ মাতানো চার তারকা—ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস, গনসালো রামোস ও নুনো মেন্দেসের পারস্পরিক রসায়ন পর্তুগাল দলের ভেতরের সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

৪. মাঝমাঠের দুই জাদুকর: ভিতিনিয়া-নেভেস

ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেস জুটি দুই মৌসুম ধরে ইউরোপিয়ান ফুটবলের মাঝমাঠ শাসন করছেন। নেভেস যখন নিখুঁত ছন্দে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেন, তখন ভিতিনিয়ার দূরদর্শী পাসিং দলকে এনে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত লিড। আজকের ম্যাচেও ভিতিনিয়ার ২১টি 'লাইন ব্রেকিং পাস' ২০১০ সালের পর বিশ্বকাপে যেকোনো পর্তুগিজ খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ।

৫. গোলবারের নিচে এক বিশ্বস্ত দেয়াল

কাগজে-কলমে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বড় বিজ্ঞাপনের নাম হলেও এই দলের আসল ত্রাতা গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা। পোর্তোর হয়ে খেলা ২৬ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক জাতীয় দলের জার্সিতে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ২০২৪ ইউরোর টাইব্রেকার কিংবা ২০২৫ নেশনস লিগের ফাইনালে পেনাল্টি থামিয়ে দেওয়া কস্তার ঠান্ডা মাথার কীর্তি পর্তুগিজদের মূল ভরসা।

৬. এক অদৃশ্য যোদ্ধা এবং ওয়ান-ম্যান আর্মি

পর্তুগিজ তারকা দিয়োগো জোতার আকস্মিক মৃত্যু ফুটবল-দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। পর্তুগাল তাই ২৬ জনের বদলে দল সাজিয়েছে ২৭ জনের—যেখানে ২৭ নম্বর নামটি প্রয়াত দিয়োগো জোতা। কোচ মার্তিনেজ স্পষ্ট বলেছেন, জোতার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতেই এবার মাঠে লড়ছে দল, যা ফুটবলারদের জন্য এক অনন্য মানসিক শক্তি ও আবেগের উৎস।

৭. এক পজিশন, বহু রূপ

পর্তুগালের প্রতিটি পজিশনে শুধু যোগ্য বিকল্পই নেই, বরং বের্নার্দো সিলভা, পেদ্রো নেতো বা জোয়াও ফেলিক্সদের মতো কিছু ‘ভার্সেটাইল’ খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা একাধিক পজিশনে সমান কার্যকর। ডানে খেলা ফুটবলার যেমন স্বচ্ছন্দে বাঁয়ে খেলতে পারেন, তেমনই মাঝমাঠের তারকারাও রূপ বদলাতে পারেন মুহূর্তে। মার্তিনেজের কাছে তাই কৌশল বদলানোর চালগুলো সব সময় তৈরি থাকছে।

৮. সুরকার ব্রুনো ফার্নান্দেজ

পর্তুগাল দলের সুর আর ছন্দ পুরোটাই নির্ভর করছে ব্রুনো ফার্নান্দেজের ওপর। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে মাঝমাঠ আর আক্রমণের ভেতরের শূন্যতা পূরণের কাজটি তিনি নিখুঁতভাবে করছেন। আজকের ম্যাচেও ৩৯ মিনিটে ব্রুনোর চোখধাঁধানো থ্রু-বল থেকেই ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি পান রোনালদো। তাঁর পা সচল থাকলে যেকোনো ডিফেন্স ভাঙা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

৯. ডাগআউটে রবার্তো মার্তিনেজ

বেলজিয়ামের ‘স্বর্ণযুগ’কে কোচিং করিয়েও ট্রফি না পাওয়া স্প্যানিশ মাস্টারমাইন্ড রবার্তো মার্তিনেজ এবার পর্তুগালের ডাগআউটে। রোনালদোদের নিয়ে টানা ১০ জয় দিয়ে যাত্রা শুরু করে মাঝে কিছুটা ছন্দ হারালেও, বিশ্বকাপের ঠিক আগে ২০২৫ নেশনস লিগের শিরোপা জিতে পর্তুগালকে ফর্মের তুঙ্গে রেখেছেন তিনি। সব ঠিক থাকলে প্রথম ‘বিদেশি’ কোচ হিসেবে তাঁর বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়া কেবলই সময়ের ব্যাপার।

১০. মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়: রোনালদোর শেষ বাজি

চল্লিশের কোটা পার করা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্য এটাই শেষ সুযোগ। টানা ১০ ম্যাচের গোলখরা নিয়ে চলা সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজ উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বমঞ্চে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করেছেন তিনি। একই সাথে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অবিস্মরণীয় বিশ্বরেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন। পাশে একঝাঁক দুর্দান্ত তরুণ তুর্কিকে নিয়ে সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরতে রোনালদো নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। লিসবনের যুবরাজের শেষ বাজি যদি সফল হয়, তবে ফুটবল ইতিহাস পাবে তার সবচেয়ে রোমান্টিক সমাপ্তি।