আসুন জেনে নেই, পেট্রিস এমেরি লুমুম্বা সম্পর্কে

আসুন জেনে নেই, পেট্রিস এমেরি লুমুম্বা সম্পর্কে

পেট্রিস এমেরি লুমুম্বা//ছবিঃ সংগৃহীত।

পেট্রিস এমেরি লুমুম্বা (Patrice Émery Lumumba) ছিলেন কঙ্গোর স্বাধীনতা আন্দোলনের এক কিংবদন্তি নেতা এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। মাত্র কয়েক মাস ক্ষমতায় থাকার পর তাকে হত্যা করা হয়, যা তাকে আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও উপনিবেশবাদ-বিরোধী আন্দোলনের একটি চিরন্তন প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে 

পেট্রিস এমেরি লুমুম্বা (১৯২৫১৯৬১) ছিলেন আফ্রিকার ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা এবং স্বাধীন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনি আজও আফ্রিকান স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা ও প্যান-আফ্রিকান ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন।

শৈশব শিক্ষা

Patrice Lumumba ১৯২৫ সালের ২ জুলাই বেলজিয়ান কঙ্গোতে (বর্তমান গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র) জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে তিনি ডাক বিভাগে চাকরি করেন এবং লেখালেখি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কঙ্গোর জনগণকে বিদেশি শাসনের অধীনে নয়, নিজেদের হাতে দেশ পরিচালনা করতে হবে।

স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা

১৯৫৮ সালে তিনি Mouvement National Congolais (MNC) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এটি ছিল কঙ্গোর প্রথম জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলোর একটি। তাঁর লক্ষ্য ছিল গোটা কঙ্গোকে একত্রিত রাখা এবং বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটানো।

কঙ্গোর স্বাধীনতা

৩০ জুন ১৯৬০ সালে কঙ্গো স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর লুমুম্বা দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। স্বাধীনতা অনুষ্ঠানে তিনি একটি বিখ্যাত ভাষণ দেন, যেখানে তিনি উপনিবেশিক শাসনের সময় আফ্রিকানদের ওপর হওয়া অবিচার ও শোষণের কথা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষণ বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়।

রাজনৈতিক সংকট

স্বাধীনতার পরপরই কঙ্গোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ কাটাঙ্গা প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করে। বেলজিয়াম ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এই সংকটে বিভিন্নভাবে জড়িয়ে পড়ে। জাতিসংঘের সহায়তা যথেষ্ট না পেয়ে লুমুম্বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছেও সাহায্য চান, যা শীতল যুদ্ধের সময় পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।

ক্ষমতাচ্যুতি হত্যা

১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি Joseph Kasa-Vubu তাকে বরখাস্ত করেন। পরে সেনাপ্রধান Mobutu Sese Seko অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। লুমুম্বাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি কাটাঙ্গায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ গোপনে ধ্বংস করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে বেলজিয়ান কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে বহু তদন্ত হয়েছে এবং বেলজিয়াম পরবর্তীতে নৈতিক দায় স্বীকার করেছে।

হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ঘটনা ও স্বীকৃতি

·         মরদেহ নিশ্চিহ্ন: হত্যার পর তার মরদেহ কবর থেকে তোলা হয়, টুকরো টুকরো করা হয় এবং সালফিউরিক অ্যাসিডে গলিয়ে ফেলা হয়, যাতে তার কোনো চিহ্ন না থাকে ।

·         আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: তার মৃত্যুতে সারা বিশ্বে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় । পরবর্তীতে বেলজিয়ামের একটি পার্লামেন্টারি কমিটি স্বীকার করে যে বেলজিয়াম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা তার হত্যাকাণ্ডে "অনস্বীকার্য দায়িত্ব" বহন করে । ২০০২ সালে বেলজিয়াম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এর জন্য ক্ষমা চায় ।

·         উত্তরাধিকার: লুমুম্বা একজন শহীদ হিসেবে পরিণত হন এবং তার নাম আফ্রিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা, ভবন ও প্রতিষ্ঠানের (যেমন রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি) নামকরণের মাধ্যমে সম্মানিত হয় ।

কেন তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ?

  • আফ্রিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক।

  • কঙ্গোর জাতীয় ঐক্যের প্রবক্তা।

  • প্যান-আফ্রিকান চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

  • উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিশ্বব্যাপী আইকন।

একটি বিখ্যাত উক্তি

"The day will come when history will speak."

বাংলা অর্থ:
"একদিন ইতিহাস নিজেই কথা বলবে।"

আজ আফ্রিকার বহু দেশে লুমুম্বাকে একজন শহীদ নেতা হিসেবে স্মরণ করা হয়, যিনি দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

শেষ কথা: পেট্রিস লুমুম্বা হয়তো হেরেছিলেন, কিন্তু তাঁর আদর্শের পরাজয় ঘটেনি। তিনি আফ্রিকার "নেলসন ম্যান্ডেলাদের" পূর্বসূরি, যাঁরা দেখিয়েছেন যে উপনিবেশের শৃঙ্খল ভাঙতে পারে ব্যক্তি মানুষ, কিন্তু সেই ব্যক্তির বলিদান জাতির চেতনায় অমর হয়ে থাকে।