পারফিউম ছেড়ে কেন আতরে ঝুঁকছে জেন-জি?
ফাইল ছবি
সুগন্ধি কে না ভালোবাসে। নিজেকে পরিপাটি রাখার শেষ পর্ব হিসেবে সুগন্ধির ব্যবহার প্রাচীন। তবে সুগন্ধি বলতে এতদিন আমরা যা বুঝতাম সেই ধারণা পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে আজকের তরুণ প্রজন্ম “জেন-জি”। এক সময় ভালো সুগন্ধি মানেই ছিল দামি বিদেশি পারফিউম বা বডি স্প্রে। আর আতর মানেই ছিল কড়া গন্ধ যা শুধু ধর্মীয় উৎসবেই ব্যবহার করা হয়। তবে সময়টা এখন বদলেছে। সুগন্ধির চেনা দুনিয়াটাই ওলটপালট করে দিলো আতর। চড়া কেমিক্যালের পারফিউম ছেড়ে এখন কাঁচের ছোট ছোট আতরের শিশি পকেটে নিয়ে ঘুরছে জেন-জি প্রজন্মের তরুণরা। চলুন জেনে নিউ এই পরিবর্তনের পেছনের রহস্য-
বদলে যাওয়া মানসিকতা ও পরিবেশ সচেতনতা
ফ্যাশন সচেতন তরুণদের মাঝে এই পরিবর্তন আকস্মিকভাবে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ এবং পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নিয়ে আজকের তরুণদের সচেতন মানসিকতা। তরুণ ক্রেতারা এখন অ্যালকোহল-মুক্ত সুগন্ধি পছন্দ করছেন। বিশ্বজুড়ে এ সংখ্যা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। বৈশ্বিক বাজার গবেষণা সংস্থা মিন্টেল-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা যায়।
আতরের ব্যবহার এখন আর ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। ছবি: সংগৃহীত
পণ্যের উপাদান ও স্বচ্ছতা
পণ্যের উপাদান ও স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে জেন-জি। তাই পারফিউমের চেয়ে আতরকে বেশি উপকারী মনে করছেন তারা। সাধারণ পারফিউমে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল বা অ্যালকোহল থাকে, যা ত্বকে শুষ্কতা তৈরি করে। অন্যদিকে, খাঁটি আতর সম্পূর্ণ অ্যালকোহল-মুক্ত এবং অর্গানিক।
স্থায়ীত্ব ও অর্থের সঠিক মূল্যায়ন
গ্লোবাল ফ্র্যাগ্রেন্স হাউজ ইবারচেমের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় সুগন্ধির বাজারের এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুগন্ধি কেনার ক্ষেত্রে এর সুভাসের স্থায়ীত্ব এবং কার্যকারিতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে জেন-জি। প্রতিটি খাতেই তারা এখন 'ভ্যালু ফর মানি' বা অর্থের সঠিক মূল্যায়ন খোঁজেন।
বাংলাদেশের মতো আর্দ্র ও গরম আবহাওয়াতে অ্যালকোহলযুক্ত পারফিউম দ্রুত বাতাসে মিলিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আতরের পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো। পারফিউম অয়েল বা আতর অনায়াসেই ত্বকের স্বাভাবিক তেলের সাথে মিশে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
আতরের মধ্যে কাস্টমাইজড আতর জেন-জি তরুণদের কাছে জনপ্রিয়। ছবি: সংগৃহীত
দেশীয় বাজারের চিত্র
দেশীয় বাজারে এই ট্রেন্ডের প্রভাব এখন সবচেয়ে স্পষ্ট। ঢাকার সুগন্ধি ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, গত দুই বছরে সাধারণ পারফিউমের তুলনায় প্রিমিয়াম ও নন-অ্যালকোহলিক লাইফস্টাইল আতরের বিক্রি প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
বিশেষ করে বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক এবং ইস্টার্ন প্লাজার সুগন্ধি শপগুলোতে এখন সবচেয়ে বেশি ভিড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ চাকরিজীবীদের।
জেন-জির এই চাহিদা মেটাতে দেশীয় বাজারে ফ্রেঞ্চ পারফিউমের সুবাসে তৈরি শত শত কাস্টমাইজড আতরের ব্লেন্ড নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়িরা।
পারফিউমের চেয়ে আতর সহজে ত্বকের সাথে মিশে থাকে। ছবি: সংগৃহীত
সুগন্ধির নোট ও লেয়ারিংয়ে নতুনত্ব
শুধু পারফরম্যান্স নয়, একইসঙ্গে বদলে গেছে সুগন্ধির নোট বা ঘ্রাণের পছন্দও। বৈশ্বিক সুগন্ধি ডেটা ট্র্যাকার 'সেন্টো'র ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে তরুণ ক্রেতাদের মাঝে এখন উদ, ব্ল্যাক আম্বার, সাফরান বা মাস্ক-এর মতো রাজকীয় ওরিয়েন্টাল নোটের চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
ইউরোপ মনিটর ইন্টারন্যাশনালের আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ তরুণ এখন একাধিক সুগন্ধি মিশিয়ে ফ্র্যাগ্রেন্স লেয়ারিং পছন্দ করছে। এই প্রজন্ম কোনো ব্র্যান্ডের নাম শুনেই অন্ধ অনুসরণ করে না। বরং নিজের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে কাস্টমাইজড সুগন্ধি পছন্দ করেন তারা। তাদের এই চাহিদা পূরণে খাঁটি আতরের বিকল্প নেই।
বাজারে তরুণদের মধ্যে পারফিউমের চেয়ে আতরের চাহিদা বেশি। ছবি: সংগৃহীত
ব্র্যান্ডগুলোর নতুন উদ্যোগ
তরুণদের বিপুল এই চাহিদা দেখে আন্তর্জাতিক প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড আল হারামাইন থেকে শুরু করে দেশীয় জোনাকি কিংবা সানজয় পারফিউমসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ফ্রেশ অ্যাকুয়াটিক, সিট্রাস ও উডি ঘরানার আধুনিক আতর বাজারে এনেছে।
আল-রেহাব বা আল-নুয়াইমের মতো সাশ্রয়ী ব্র্যান্ডের পাশাপাশি নামী ব্র্যান্ডগুলোর সিগনেচার আউটলেট ও অফিশিয়াল ওয়েবসাইটগুলোয় তরুণ ক্রেতাদের ভিড় লেগে রয়েছে।
প্রতিটি শিল্পের মতো সুগন্ধির দুনিয়াতেও পারফিউমের চড়া রাসায়নিকের কৃত্রিমতা ছেড়ে অর্গানিক পণ্যের এই নতুন ট্রেন্ডই প্রমাণ করে—আতরই এখন আধুনিক তরুণদের লাইফস্টাইলের নতুন ট্রেন্ড।