বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় সিরিয়ার ওমারি মসজিদ
সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৩ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দেরা শহরের ঐতিহাসিক আল-ওমারি মসজিদ। সিরিয়াসহ পুরো লেভান্ত অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এই মসজিদের নাম জড়িয়ে আছে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) সঙ্গে। গত কয়েক দশকে মসজিদটি শুধু ধর্মীয় ইবাদতখানা হিসেবে ব্যবহার হয়নি, বরং সিরিয়ার যুদ্ধ ও বিপ্লবের এক অনন্য জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এবার সেই ঐতিহাসিক স্থাপত্যটি ইসলামিক ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের (ইসেসকো) বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে খলিফা ওমরের (রা.) শাসনামলে এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তার নামানুসারেই এই নামকরণের মাধ্যমে তৎকালীন গৌরবময় যুগের স্মৃতি ধরে রাখা হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মসজিদটি সিরিয়ার হওরান অঞ্চলের একটি প্রধান ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত।
সিরিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে এর অবস্থান সুসংহত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মসজিদটিকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই স্বীকৃতির ফলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংরক্ষণ, নথিবদ্ধকরণ এবং পুনর্নির্মাণের নতুন পথ উন্মোচন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আল-ওমারি মসজিদের ইমাম শায়খ বাসাম আল-মাসরি আল জাজিরাকে বলেন, সিরিয়ার জনগণ, বিশেষ করে দেরা শহরের মানুষের হৃদয়ে এই মসজিদের স্থান অত্যন্ত উঁচুতে।মসজিদটি শুধু নামাজের স্থান ছিল না, বরং সিরিয়ার বিপ্লবের শুরুর দিনগুলোতে বিক্ষোভকারীদের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। মসজিদের চত্বরেই প্রথম গড়ে তোলা হয়েছিল যুদ্ধের আহতদের চিকিৎসার জন্য অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল।
শায়খ বাসাম আরও জানান, যুদ্ধের বছরগুলোতে মসজিদর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে এর ঐতিহাসিক মিনার এবং মূল ভবনের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এর সংস্কার কাজ শুরু হলেও এর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যশৈলীর মান ধরে রাখতে আরও দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ও বড় ধরনের পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
ইসলামী ইতিহাস গবেষক মুসা আল-মুসালামা আল জাজিরাকে বলেন, লেভান্ত বা শাম অঞ্চলে নির্মিত শুরুর দিককার মসজিদগুলোর একটি হওয়ায় আল-ওমারি মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামী স্থাপত্যের ইতিহাসে এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় এর অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে মুসলিম বিশ্ব এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি রক্ষায় কতটা আন্তরিক। মসজিদটি হওরান অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস ও পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই সঙ্গে এটি এমন এক জাতীয় প্রতীক, যা স্থানীয়দের সামষ্টিক স্মৃতিতে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে।
কালের আবর্তে টিকে থাকা প্রাচীন দেওয়াল আর যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে দেরা শহরের আল-ওমারি মসজিদ আজও ইসলামের সোনালী অতীত এবং আধুনিক ইতিহাসের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু অপেক্ষা, যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে লেভান্ত অঞ্চলের অন্যতম প্রধান এই সভ্যতার স্মারক যেন আবার তার পুরনো গৌরব ফিরে পায়।