বিশ্বকাপ মাঠে ফুটবলারদের সিজদা কি শুধুই উদযাপন?
ফাইল ছবি
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই গ্যালারিজুড়ে আছড়ে পড়ে শতকোটি দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার। ফ্লাডলাইটের তীব্র আলো আর ক্যামেরার লেন্সগুলো এক পলকে খুঁজে নেয় আনন্দ-বেদনার সব রঙ। মাঠের বুক চিরে খেলোয়াড়দের বাঁধভাঙা উল্লাস ও তীব্র আবেগের এই বিস্ফোরণই আধুনিক ক্রীড়াবিশ্বের সবচেয়ে চেনা ছবি। কিন্তু কোটি মানুষের এই তুমুল শোরগোল আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকানির মাঝেই ইদানীং সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য বিশ্বমঞ্চের চিরচেনা সংজ্ঞাকে বদলে দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন বোর্ড টপকে গ্যালারির দিকে ছুটে যাওয়া কিংবা হাঁটু গেড়ে কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে স্লাইড করার চেনা গণ্ডি পেরিয়ে মুসলিম ফুটবলাররা মাঠের এক কোণে থমকে দাঁড়াচ্ছেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা হাঁটু গেড়ে বসে কপাল ঠেকাচ্ছেন সবুজ ঘাসে। করছেন সিজদা। পেশাদার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উন্মাতাল মুহূর্তে দাঁড়িয়েও তারা বেছে নিচ্ছেন এক পরম শান্তিময় নীরব প্রার্থনার পথ।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এই চেনা ইসলামী রীতিনীতি বা ‘সিজদা’ আধুনিক ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন এক গল্পে পরিণত হয়েছে। এই উদযাপন শুধু খেলার জয়-পরাজয়ের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে।
অমুসলিম দেশে বসবাসকারী মুসলিম ও তরুণ প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের দর্পণ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, লন্ডনের ড্রয়িংরুম, টরন্টোর অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা আলজিয়ার্সের জনাকীর্ণ ক্যাফেতে বসে যেসব তরুণ জেন-জি ও মিলেনিয়াল মুসলিম ভক্তরা আন্তর্জাতিক টেলিভিশনের পর্দায় এই দৃশ্য সরাসরি দেখছেন, তাদের জন্য তা এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি করছে।
দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিমা বা মূলধারার সমাজে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে (ইউরোপ ও যেসব দেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু) প্রায়শই তাদের ধর্মীয় পরিচয় বা রীতিনীতি প্রকাশে কিছুটা দ্বিধাবোধ করতে হয়েছে। তবে বিশ্বমানের অ্যাথলেটদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যে এভাবে বুক ফুলিয়ে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরতে দেখা সেই পুরনো ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। খেলার মাঠ এখন আর শুধু শারীরিক সক্ষমতার লড়াইয়ের জায়গা নয়, বরং এটি এমন এক বিশাল মঞ্চ যেখানে তাদের প্রাত্যহিক বিশ্বাস অত্যন্ত মর্যাদা ও সম্মানের সাথে স্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠছে।
কোনো খেলোয়াড় যখন সবুজ ঘাসে সিজদা করেন, তখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তরুণ মুসলিমরা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক পরম সুন্দর প্রতিফলন দেখতে পান। এই দৃশ্য তাদের মনের ভেতরে এক গভীর আত্মবিশ্বাস জোগায় এবং মনে করিয়ে দেয় যে, বৈশ্বিক মঞ্চে দারুণ কিছু অর্জন করতে হলে নিজের সত্তা বা পরিচয়কে বিসর্জন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
অহংকার বনাম নম্রতা
সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাইরেও এই সিজদার একটি মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে, যা আধুনিক তারকা খ্যাতির চেনা অহংকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। অভিজাত ক্রীড়াজগতে যে কোনো জয়কে সাধারণত একক কৃতিত্ব, ব্যক্তিগত রেকর্ড ভঙ্গ কিংবা নিখুঁত কৌশলের গৌরব হিসেবেই দেখা হয়।
সিজদার এই রূপ সেই চিরচেনা অহমবোধকে এক নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দেয়। শরীরের সবচেয়ে সম্মানিত অংশ—কপালকে মাটিতে লুটিয়ে দিয়ে একজন অ্যাথলেট মূলত স্পটলাইটের আলো থেকে নিজেকে আড়াল করে নেন। এর মাধ্যমে একটি শারীরিক ঘোষণা প্রদান করা হয় যে, তারা নিজেদের এই অভাবনীয় সাফল্যের একমাত্র কারিগর নন।
পবিত্র কোরআনের সূরা হজের একটি আয়াতে বলা হয়েছে, হে ইমানদারগণ! তোমরা রুকু করো, সিজদা করো, তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করো এবং সৎ কাজ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।
এই বাণীই খেলোয়াড়দের মানসিকতাকে গড়ে তোলে—প্রকৃত সাফল্য বা বিজয় কখনো ব্যক্তিগত অহংকারের ফসল হতে পারে না। বরং আসল সার্থকতা লুকিয়ে আছে পরম বিনম্রতা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকারের মাঝে।
ব্যক্তিগত প্রশংসা কুড়ানোর মোহ থেকে দূরে সরে গিয়ে তৎক্ষণাৎ কৃতজ্ঞতার এই বহিঃপ্রকাশ প্রমাণ করে যে, জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণের মুহূর্তেও বিনম্র থাকাই শ্রেষ্ঠতম সুন্দর আচরণ।
মূল্যবোধের এক চিরন্তন ঐতিহ্য
ফুটবলের চুলচেরা কৌশল যারা নিয়মিত মেপে চলেন কিংবা জীবনে কোনোদিন আস্ত একটা ম্যাচও দেখেননি— ফুটবলারদের সিজদার দৃশ্য সবার হৃদয়েই এক গভীর মানবিক দোলা দেয়। এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের জীবনযাত্রা যতই দ্রুতগতির বা জাঁকজমকপূর্ণ হোক না কেন, সেখানে আত্মোপলব্ধির একটু জায়গা থাকা উচিত।
মাঠের ভেতরের এই সিজদা আসলে এই বার্তা দেয়—আপনি যখন সাফল্যের একদম চূড়ায় পৌঁছাবেন, তখন আপনার নেওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানটি হওয়া উচিত রবের প্রতি পরম কৃতজ্ঞতার।