পাহাড় ধসে মৃত্যু হলে কি শহীদি মর্যাদা পাওয়া যায়?

পাহাড় ধসে মৃত্যু হলে কি শহীদি মর্যাদা পাওয়া যায়?

ফাইল ছবি

প্রবল বর্ষণে দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা প্রায়ই প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন দুর্ঘটনায় কোনো মুমিন ব্যক্তি মারা গেলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে- ইসলামের দৃষ্টিতে তিনি কি শহীদের মর্যাদা পাবেন?
কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, আল্লাহর পথে যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাতই শহীদের একমাত্র ধরন নয়। কিছু বিশেষ ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ে মৃত্যুবরণকারী মুমিনদের সম্পর্কেও রাসূলুল্লাহ (স.) শহীদের মর্যাদার সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে শহীদ হয়েছেন—এমন ঘোষণা দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই। এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলার।

হাদিসে শহীদের প্রকারভেদ

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘শহীদ পাঁচ প্রকার: মহামারীতে মৃত, পেটের পীড়ায় মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত এবং যে আল্লাহর পথে শহীদ হলো।’ (সহিহ বুখারি: ২৮২৯ ও সহিহ মুসলিম: ১৯১৪)

এ ছাড়া জাবির ইবনে আতিক (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) শহীদের সাতটি প্রকার উল্লেখ করেছেন। সেখানেও চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারীকে শহীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ: ৩১১১)

পাহাড় ধস কি ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ার অন্তর্ভুক্ত?

ইসলামি বিদ্বানদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হাদিসে ব্যবহৃত ‘আল-হাদম’ বলতে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকে বোঝানো হয়েছে। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে শরফ আন-নববি (রহ.) 'শারহ সহিহ মুসলিম'-এ 'সাহিবুল হাদম' বলতে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারীকে বুঝিয়েছেন। এ ব্যাখ্যার আলোকে অনেক সমকালীন আলেম পাহাড়ধসে মাটি বা পাথরের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুকে এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।

সে হিসেবে কোনো মুমিন ব্যক্তি পাহাড় ধসে চাপা পড়ে মারা গেলে তিনি ইনশাআল্লাহ হাদিসে বর্ণিত এই ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হবেন। 

ফিকহি দৃষ্টিতে এদের মর্যাদা

ইমাম নববি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, হাদিসে বর্ণিত এসব ব্যক্তি ‘শহীদুল আখিরাহ’। অর্থাৎ তারা আখেরাতে শহীদের সওয়াব ও মর্যাদা লাভ করবেন। তবে দুনিয়ার বিধানের ক্ষেত্রে তাদের গোসল, কাফন ও জানাজা সাধারণ মুসলিমের মতোই সম্পন্ন করা হবে; যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাতবরণকারী শহীদের মতো নয়। এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিন বান্দার জন্য বিশেষ অনুগ্রহ।

বিপদে ধৈর্য ধারণের শিক্ষা

মুমিনের জীবনে বিপদ-আপদ আল্লাহর পরীক্ষা। এ সময় ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম। 
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে পড়লে বলে, 'নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তাঁরই কাছে ফিরে যাব। তাদের ওপরই তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত।’ (সুরা বাকারা: ১৫৫–১৫৭)

জীবন রক্ষায় সতর্কতা: ইসলামের শিক্ষা

ইসলাম যেমন শাহাদাতের মর্যাদা বর্ণনা করেছে, তেমনি জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনেরও নির্দেশ দিয়েছে। 
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।’ (সুরা বাকারা: ১৯৫)

আলেমরা এ আয়াত থেকে অকারণে নিজেকে বিপদ বা ধ্বংসের মুখে ঠেলে না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন। তাই পাহাড় ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা কিংবা দুর্যোগের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা থেকে বিরত থাকা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আমাদের করণীয় হলো- মৃতদের জন্য আল্লাহর কাছে রহমত ও মাগফেরাতের দোয়া করা, শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা।