আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের ঝুঁকিতে কাগজ শিল্প : বন্ধ হয়ে গেছে ৮০ মিল, ঝুঁকিতে ২৬
ছবি: ফাইল ফটো
অস্বাভাবিক কম মূল্যে বিদেশ থেকে তৈরি কাগজ আমদানির (আন্ডার ইনভয়েসিং) কারণে চরম সংকটের মুখে পড়েছে দেশের কাগজ শিল্প। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইতোমধ্যে ৮০টি মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও ২৬টি মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
শিল্প রক্ষা ও রাজস্ব ক্ষতি রোধে আমদানিকৃত কাগজের ‘মিনিমাম এক্সেস ভ্যালু’ বা ন্যূনতম কর নির্ধারণযোগ্য মূল্য প্রতি টনে ৯৪৫ মার্কিন ডলার করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ)।
এ অবস্থায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ধরনের কাগজ আমদানি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ)।
সম্প্রতি এমন দাবিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পাশাপাশি সংগঠনটি জানায়, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মাত্র ৬০০ মার্কিন ডলার মূল্য দেখিয়ে তৈরি কাগজ আমদানি করা হচ্ছে। এতে সরকার শতকোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
চিঠিতে বলা হয়, মুদ্রণ শিল্পের কিছু প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক কম দামে বিদেশ থেকে তৈরি কাগজ আমদানি করায় দেশীয় কাগজ শিল্প গভীর সংকটে পড়েছে। কাগজ শিল্প একটি শ্রমঘন ও ভারী বিনিয়োগনির্ভর খাত, যেখানে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং পরোক্ষভাবে অর্ধকোটি মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল।
বিপিএমএর দাবি, দেশীয় কাগজ উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল পাল্পের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বর্তমানে প্রতি টনে প্রায় ৬৩০ মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাসায়নিক, শ্রম, যন্ত্রপাতির অবচয়সহ রূপান্তর ব্যয় যোগ করলে তৈরি কাগজের কর নির্ধারণযোগ্য মূল্য অন্তত ৯৪৫ মার্কিন ডলার হওয়া উচিত।
সংগঠনটির হিসাবে, ৯৪৫ ডলারের ওপর ৬৪ দশমিক ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক যোগ করলে প্রতি টনের করযোগ্য মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৫২ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৪৪৮ টাকা।
চিঠিতে তারা অভিযোগ করেন, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মাত্র ৬০০ মার্কিন ডলার মূল্য দেখিয়ে তৈরি কাগজ আমদানি করা হচ্ছে। এতে সরকার প্রতি টনে প্রায় ২২২ মার্কিন ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে। ২০ হাজার টন কাগজ আমদানির ক্ষেত্রে এই রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৫ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এভাবে কম মূল্যে কাগজ আমদানির কারণে দেশীয় শিল্পে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮০টি কাগজ মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও ২৬টি মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
বিপিএমএর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি কাগজের প্রকৃত মূল্য, কাঁচামালের দাম ও উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় প্রতি টনে তৈরি কাগজের কর নির্ধারণযোগ্য মূল্য কোনোভাবেই এক হাজার মার্কিন ডলারের কম হওয়ার সুযোগ নেই।
এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় কাগজ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা, কর্মসংস্থান সরকারের ন্যায্য রাজস্ব নিশ্চিত করতে আমদানি করা তৈরি কাগজের ন্যূনতম কর নির্ধারণযোগ্য মূল্য ৯৪৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণের পাশাপাশি ২৯.০৫ ইঞ্চি রোল, ২০/৩০ সাইজের শিট এবং ৭০/৮০ জিএসএম অফ-হোয়াইট ন্যাচারাল শেড প্রিন্টিং পেপার আমদানি নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।