সম্পর্ক বিচ্ছেদ : হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থেকে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি
ফাইল ছবি
চারপাশে তাকালে সহজেই কিছু সম্পর্কের বিচ্ছেদ দেখা যায়। এমনকি অনেক সময় আমরা সেসব বিচ্ছেদের সাক্ষীও হয়ে তাকি। হতে পারে তা প্রেমের সম্পর্ক কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক। বিচ্ছেদ, প্রতারণার শিকার বা প্রিয়জনকে হারানোর ব্যথা কেবল একজন মানুষকে মানসিক কষ্টই দেয় না, বরং শারীরিক কষ্টও দেয়। গত দুই দশকে প্রকাশিত গবেষণাগুলো থেকে দেখা গেছে―তীব্র আবেগীয় আঘাত মানুষের হরমোন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের নিংশিয়া মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস গ্র্যাজুয়েট ও মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক ডা. প্রিন্স ঘোষ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উটাহর মনোবিজ্ঞানী ড. লিসা এম. ডায়মন্ড, এঞ্জেলা এম. হিক্স ও কিমবার্লি ডি. ওত্তার-হেন্ডারসন ২০০৮ সালে ৪২টি দম্পতির ওপর ২১ দিন একটি গবেষণা করেন, যা পরবর্তীতে জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজিতে প্রকাশিত হয়।
এ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক দিনের বিচ্ছেদেই শরীরে কর্টিসল অর্থাৎ স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। এর ফলে ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, ক্লান্তি এবং আরও বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। গবেষকদের মতে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে মানুষের মস্তিষ্ক নিরাপত্তার উৎস হিসেবে দেখে থাকে। কিন্তু সেটা হঠাৎ হারিয়ে গেলে শরীরে হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল এক্সিস সক্রিয় হয়ে স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়া বেড়ে যায়।
ডা. প্রিন্স ঘোষ বলেন, আমরা প্রায়ই আমাদের আশপাশের কারও বিচ্ছেদ হলে তাকে বিভিন্ন কথা বলে সান্ত্বনা দিতে চাই এবং এই কষ্টকে তুচ্ছ হিসেবে দেখতে বলি। তবে এই কষ্ট যে তুচ্ছ নয়, তারও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের মনোবিজ্ঞানী ড. ইথান ক্রস প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্রে দেখান, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার স্মৃতি মনে করলে মস্তিষ্কের যে অংশ শারীরিক ব্যথা অনুভবের সময় সক্রিয় হয়, অর্থাৎ মস্তিষ্কের সামনের সিংগুলেট কর্টেক্সের উপরের অংশ এবং মস্তিষ্কের সামনের ইনসুলা অঞ্চল সক্রিয় হয়।
২০২৪ সালে সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত একটি বৃহৎ মেটা-অ্যানালাইসিসে ৯৪টি গবেষণাপত্র ও প্রায় ১৩ দশমিক ৮ লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেন, সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর কিছু মানুষের মধ্যে হৃদরোগ, শারীরিক অসুস্থতা এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
বিচ্ছেদের সবচেয়ে গুরুতর তবে বিরল শারীরিক জটিলতা হলো ‘টাকোৎসুবো সিনড্রোম’ বা ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’।
এই জটিলতার কারণে হৃদযন্ত্রের বাম নিলয় সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে বুকব্যথা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। শুধু তা-ই নয়, ইসিজিতে এমন পরিবর্তন দেখা যায়, যা কিনা হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে মিলে যায় বলে জানান এ মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক।
ডা. প্রিন্স ঘোষ জানান, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৯০ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনা সারভার হার্ট সেন্টারের ড. মোহাম্মদ রেজা মোভাহেদ ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণা করেন, যা ২০২৫ সালে জার্নাল অব দ্য আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-এ প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, রোগীদের ৮৩ শতাংশ নারী হলেও পুরুষদের মৃত্যুহার প্রায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ, যা নারীদের (৫ দশমিক ৫ শতাংশ) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। সামগ্রিক মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অধিকাংশ রোগী চিকিৎসায় সুস্থ হলেও এ রোগে কার্ডিওজেনিক শক, হার্ট ফেইলিউর, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন এবং স্ট্রোকের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ চিকিৎসক বলেন, বিচ্ছেদের পর শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবেও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়মত চিকিৎসা, পরিবার, বন্ধুবান্ধবের সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনেক ক্ষেত্রেই গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।