কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে হাঁটার উপকারিতা জানুন

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে হাঁটার উপকারিতা জানুন

প্রতীকী ছবি

প্রতিদিন হাঁটার অভ্যাস রক্তে চর্বির মাত্রা উন্নত করতে পারে। এটি উচ্চ-ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা তথাকথিত ‘ভালো কোলেস্টেরল’-এর মাত্রা বাড়ায়। পাশাপাশি এটি নিম্ন-ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

হাঁটার ফলে শরীরে এমন কিছু এনজাইম বা উৎসেচক উদ্দীপিত হয়, যা অস্বাস্থ্যকর চর্বি ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে। হৃদযন্ত্র ভালো রাখার জন্য বিশেষজ্ঞরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি গতিতে দ্রুত হাঁটার পরামর্শ দেন। 

কোলেস্টেরল কমানোর ক্ষেত্রে দৈনিক হাঁটার পদক্ষেপ বাড়ানো একটি চমৎকার সূচনা হতে পারে। 

মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরের ‘জনস হপকিন্স সিকারন সেন্টার ফর দ্য প্রিভেনশন অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ’-এর পরিচালক, কার্ডিওলজিস্ট ও অধ্যাপক ড. রজার ব্লুমেন্থাল বলেন, ব্যায়ামের এই উপকারিতার পেছনের সম্পূর্ণ কারণ এখনো পুরোপুরি জানা না গেলেও এর ইতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট। অ্যারোবিক ব্যায়াম ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে পরিচিত। 

স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথসেন্ট্রাল’-এর সূত্র ধরে তিনি আরও জানান, যে কোনো শারীরিক ক্রিয়াকলাপ যা হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, তা কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং রক্তচাপ—উভয়ই উন্নত করতে পারে। 

ড. ব্লুমেন্থাল বলেন, হাঁটা একটি সহজ ব্যায়াম যা অনায়াসেই দৈনিক রুটিনের অংশ করে নেওয়া যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝারি গতিতে নিয়মিত হাঁটা উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত গতিতে দৌড়ানোর মতোই কার্যকর। 

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন খারাপ কোলেস্টেরল এবং উচ্চ রক্তচাপ কমাতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিটের মাঝারি অ্যারোবিক ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময় বাড়িয়ে প্রতি সপ্তাহে ২০০ মিনিট করতে পারলে আরও বেশি স্বাস্থ্যগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

এর হিসাব দাঁড়ায় সপ্তাহে পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে, অথবা প্রতিদিন ২০ মিনিটের কিছু বেশি সময় হাঁটা। 

এই ব্যায়াম যে এক টানেই শেষ করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। দিনে দুবার ১০ মিনিট করে হাঁটলেও তা স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা দৈনিক হাঁটার পরিমাণ বাড়ানো, কোলেস্টেরল কমানো এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাসের জন্য একটি ব্যবহারিক পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।

যারা সাধারণত শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয়, তারাও দৈনন্দিন চলাফেরা সামান্য বাড়ানোর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। ড. ব্লুমেন্থাল বলেন, প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটলেও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যগত সুবিধা পাওয়া যায়।

গবেষণাও এই পরামর্শকে সমর্থন করে। 

‘দ্য ল্যানসেট’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে মাত্র ১৫ মিনিটের পরিশ্রমের ব্যায়াম নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের তুলনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ কমিয়ে দেয়। 

বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন অল্প সময় হাঁটা দিয়ে শুরু করার পরামর্শ দেন। 

একটি বাস্তবসম্মত সময় বেছে নিন এবং ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তুলুন। যদি ছুটির দিনে আপনার সময় ভালো মেলে, তবে শুক্র ও শনিবার দীর্ঘ সময় হাঁটুন এবং কর্মদিবসে অপেক্ষাকৃত কম সময় হাঁটুন। কোলেস্টেরল ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের স্থায়ী উন্নতির জন্য হাঁটাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নেওয়া জরুরি। 

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক সেশনের ব্যায়াম কোলেস্টেরলের ওপর খুব সামান্যই প্রভাব ফেলে। কিন্তু ১৮ সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে ১৬০ মিনিট অ্যারোবিক ব্যায়ামের ফলে ভালো কোলেস্টেরল স্পষ্ট বৃদ্ধি পায়। 

ড. ব্লুমেন্থাল বলেন, মানুষ হয়তো শুরুতেই সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হাঁটার লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না, তবে এই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলেও দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত হতে শুরু করে। 

দৈনিক ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করুন (প্রয়োজনে সেশনটি ভাগ করে নিতে পারেন)। এটি আপনাকে সপ্তাহে ২০০ মিনিটের গণ্ডি পার করিয়ে দেবে, যা আরও বেশি স্বাস্থ্যগত সুবিধা আনবে। 

একবার হাঁটা যখন দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হবে, বিশেষজ্ঞরা তখন এর সঙ্গে কিছু সময়ের জন্য দ্রুত হাঁটার অংশ যোগ করার পরামর্শ দেন। 

হাঁটার গতি বাড়ানো

হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য মানুষকে দৌড়ানো শুরু করতে হবে না। কেবল একটু দ্রুত হাঁটার মাধ্যমেই বাড়তি সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ-তীব্রতার অ্যারোবিক ব্যায়াম খারাপ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে পারে। ড. ব্লুমেন্থাল প্রতি ঘণ্টায় অন্তত তিন মাইল গতিতে হাঁটার এবং ধীরে ধীরে কিছু কিছু হাঁটার সেশনে গতি বাড়িয়ে ঘণ্টায় চার মাইল করার পরামর্শ দেন।

বিশেষজ্ঞরা একটি চার সপ্তাহের কর্মসূচির পরামর্শ দেন। কর্মসূচিটি সম্পন্ন করার পর, অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুবার দ্রুত হাঁটা বজায় রাখুন। 

উল্লেখ্য, যে কোনো নতুন ব্যায়াম কর্মসূচি শুরু করার আগে তা আপনার জন্য উপযুক্ত কিনা তা নিশ্চিত করতে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। একই সঙ্গে, কোলেস্টেরল কমানোর সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারি খাদ্যতালিকা নিয়েও আলোচনা করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। 

সূত্র: সামা টিভি